একের পর এক খুন, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

দুপুরের ব্যস্ত বাজার। চারপাশে মানুষের কোলাহল। কেউ সবজি কিনছেন, কেউ চায়ের দোকানে আড্ডায় মগ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ ভেসে আসে

2026-06-20T12:37:08+00:00
2026-06-20T12:37:08+00:00
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
আতঙ্কের মানচিত্রে দুই জনপদ
একের পর এক খুন, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দুপুরের ব্যস্ত বাজার। চারপাশে মানুষের কোলাহল। কেউ সবজি কিনছেন, কেউ চায়ের দোকানে আড্ডায় মগ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ ভেসে আসে গুলির শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উৎসবমুখর জনপদ পরিণত হয় আতঙ্কের নগরীতে। মানুষ ছুটতে থাকে প্রাণ বাঁচাতে, দোকানের শাটার নামতে শুরু করে একের পর এক।

এ দৃশ্য কোনো সিনেমার নয়। এটি চট্টগ্রামের রাউজানের চৌমুহনী বাজারের বাস্তব চিত্র। আবার দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যস্ত নগরী খুলনায় আদালত চত্বরের সামনে দিনের আলোয় ঘটে যায় আরেকটি হত্যাকাণ্ড। বিচারপ্রার্থীদের ভিড়, আইনজীবীদের আনাগোনা, পুলিশের উপস্থিতি, সবকিছুকে যেন উপেক্ষা করেই হামলাকারীরা প্রকাশ্যে হত্যা করে তাদের টার্গেটকে। 

দুটি ঘটনা। দুটি অঞ্চল। কিন্তু আতঙ্কের ভাষা একই।

গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, অপরাধীরা কেন এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে? কেন জনসমক্ষে অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে? আর কেন সাধারণ মানুষ ক্রমশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছে?

বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারির পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, প্রতিশোধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব, সব মিলিয়ে যেন সহিংসতার এক অদৃশ্য জাল ছড়িয়ে পড়ছে জনপদ থেকে জনপদে।

গুলির শব্দে থমকে যাওয়া জনপদ চট্টগ্রামের রাউজান : গত ১৩ জুন দুপুর। রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে তখন স্বাভাবিক ব্যস্ততা। হঠাৎ অস্ত্রধারীদের একটি দল বাজারে প্রবেশ করে। তাদের লক্ষ্য ছিলেন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডা ছাড়াই মাসুদকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মুহূর্তেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মৃত্যু নিশ্চিত করতে হামলাকারীরা আরও কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া সেই দৃশ্য পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ ঘটনায় জড়িতদের বেশ কয়েকজন একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামনে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

দুই বছরে ২৫ খুন: রাউজানের উদ্বেগজনক বাস্তবতা : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি এই খুনের সংখ্যা ৩০টির বেশি। এসব ঘটনার অধিকাংশের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই বছরে শতাধিক সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে চান না। 

বিশেষ করে পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলগুলোকে অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, রাউজান কি ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ সহিংসতার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে?

আদালতপাড়া থেকে বাজার, রক্তের দাগ খুলনার সর্বত্র : একসময় তুলনামূলক শান্ত নগরী হিসেবে পরিচিত খুলনাও এখন ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত ১৭ মাসে খুলনা মহানগরীতে অন্তত ৫১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং পারিবারিক বিরোধ, এসব কারণই হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে খুলনার আদালত এলাকায়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে হাজিরা শেষে বের হওয়ার সময় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটে দিনের বেলায়, অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে। 

এই হত্যাকাণ্ড শুধু দুটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং জনমনে বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি ছিল সুপরিকল্পিত হামলা।

ডাকবাংলো মোড়ে রক্তাক্ত বিকেল : এর আগে নগরীর ব্যস্ত ডাকবাংলো মোড়ে শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এ ঘটনার অন্যতম কারণ।

অপহরণ, ডেকে নেওয়া, তারপর লাশ : খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণের পর হত্যা কিংবা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। সাচিবুনিয়া এলাকায় এক যুবককে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অন্য একটি ঘটনায় পরিচিতজনের ডাকে সাড়া দিয়ে বের হওয়ার পর আর জীবিত ফিরে আসেননি এক ব্যক্তি। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা হত্যার আগে হুমকি পেয়েছিলেন। কিন্তু কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সামাজিক অবক্ষয় ও পারিবারিক সহিংসতা : অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, উদ্বেগজনক বিষয় হলো- হত্যাকাণ্ড এখন আর শুধু রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসী সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাদকাসক্তি, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও হত্যার বড় কারণ হয়ে উঠছে। 

খুলনায় মাদকের টাকার জন্য নিজের মাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে এক যুবককে আটক করার ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে শিশু ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনাগুলোও সমাজের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।

কেন থামছে না রক্তপাত? : বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এরই মধ্যে, রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত, প্রতিশোধের সংস্কৃতি, সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাওয়া। তাদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

আতঙ্কে সাধারণ মানুষ : রাউজানের চৌমুহনী বাজার, খুলনার আদালতপাড়া কিংবা ডাকবাংলো মোড়, সব জায়গার মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। মানুষ এখন প্রকাশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হতে ভয় পান। অনেকে কিছু দেখলেও মুখ খুলতে চান না। ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী, সবার মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। 

স্থানীয়দের ভাষায়, কয়েক বছর আগেও প্রকাশ্যে এভাবে হামলা চালানোর ঘটনা এত ঘনঘন দেখা যেত না। এখন অপরাধীরা আরও সংগঠিত, আরও সশস্ত্র এবং আরও বেপরোয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক উধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ‘ভোরের ডাক’কে বলেন,  আলোচিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, একের পর এক হত্যাকাণ্ড মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে, কেন অপরাধীরা এত সহজে প্রকাশ্যে হামলা চালাতে পারছে? কেন একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে?

উল্লেখ্য, রাউজান থেকে খুলনা, দুই অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ যেন একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। যখন রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের মীমাংসা আইনের পরিবর্তে অস্ত্রের ভাষায় হতে শুরু করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, দ্রুত তদন্ত, কার্যকর বিচার এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া এই সহিংসতার চক্র ভাঙা কঠিন। 

অন্যথায় রাউজানের কোনো বাজার, খুলনার কোনো আদালতপাড়া কিংবা দেশের অন্য কোনো জনপদ, যেকোনো সময় পরিণত হতে পারে পরবর্তী রক্তাক্ত ঘটনার মঞ্চে। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: