কৃষিতে সার ও কীটনাশকের অযৌক্তিক ব্যবহার কমাতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। লক্ষ্য হলো উৎপাদন ধরে রাখা, খরচ কমানো এবং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। কৃষি কার্ডধারী কৃষকদের হাতে দেওয়া হবে বৈজ্ঞানিক পরামর্শ। মাটি পরীক্ষা করে জানানো হবে কোন জমিতে কত সার প্রয়োজন। একই সঙ্গে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও থাকবে নির্দিষ্ট নির্দেশনা।
কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন সব সময় বাড়ে না। বরং মাটির উর্বরতা কমে যায়। পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একইভাবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে জমি, পানি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিক সার হলো ইউরিয়া। এর পাশাপাশি টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ও অন্যান্য নন-ইউরিয়া সারও ব্যবহার করা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ইউরিয়া সারের ব্যবহার প্রায় ২৬ থেকে ২৮ লাখ টনের মধ্যে ওঠানামা করে। অন্যদিকে নন-ইউরিয়া সারের সম্মিলিত ব্যবহার প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ টনের মধ্যে থাকে। ফসল ও মৌসুমভেদে এই পরিমাণ পরিবর্তিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষম হারে সার ব্যবহার না হলে ফসলের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন। অনেক এলাকায় ইউরিয়া বেশি ব্যবহার হলেও ফসফেট ও পটাশজাতীয় সারের ব্যবহার কম হয়। এতে মাটিতে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সার ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে। যা সার আমদানিকারকদের ব্যবসা পরিচালনা সহজতর করবে এবং কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে দেশীয় কৃষিখাতকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
এবিষয়ে সার ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে সারাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে সার ও কীটনাশকের দাম স্বাভাবিক ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে। ভ্যাট আদায় ও সমন্বয় সংক্রান্ত জটিলতা কমে যাওয়ায়, খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের সার বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক হয়রানি ও আইনি ঝামেলা উল্লেখযোগ্য হারে কমবে বলে তারা আশাবাদী।
জাতীয় বাজেটে কীটনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে করহার কমানো এবং ৩৬টি কাঁচামালের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেশীয় উৎপাদনকারীদের (যেমন- বালাইনাশক সার উৎপাদনকারী) জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সার উৎপাদন উৎসাহিত হবে এবং বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে।
বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) সহ অন্যান্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা একে কৃষি খাত ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশে সরকারের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ যা দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আগে ফিনিশড কীটনাশক প্রোডাক্টেও ভ্যাট ছিল না, সেখানে দেশি উৎপাদকদের কাঁচামালে ভ্যাট ছিল। যে কারণে অনুমোদন থাকা শর্তেও দেশি অনেক প্রতিষ্ঠান কীটনাশক উৎপাদনে যেতে পারেনি।
এখন স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এ খাতে রেয়াতি সুবিধার কারণে দেশে উৎপাদন বাড়বে। এরমাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমবে। কর্মসংস্থান হবে, কৃষকরাও কম দামে কীটনাশক পাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি মন্ত্রনালয়ের একজন যুগ্মসচিব বলেন, কৃষি ব্যবস্থাপনার আমুল পরিবর্তন আনতে কৃষি কার্ডধারী কৃষকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কৃষি কার্ডের আওতায় থাকা কৃষকদের জমির মাটি পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে প্রয়োজনীয় সারের মাত্রা। এরপর কৃষকদের হাতে দেওয়া হবে লিখিত বা ডিজিটাল পরামর্শ।
তিনি আরো বলেন, সরকারের লক্ষ্য, অনুমাননির্ভর সার ব্যবহার কমিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু করা। এতে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমবে। একই সঙ্গে সারের অপচয়ও হ্রাস পাবে। মাটির অম্লত্ব বা পিএইচ পরীক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ জমির অম্লত্বের মাত্রা বেশি বা কম হলে গাছ ঠিকমতো পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। তাই মাটি পরীক্ষা করে কৃষকদের জানানো হবে তাদের জমির বর্তমান অবস্থা। প্রয়োজন হলে চুন বা অন্য উপাদান ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হবে। সব জমির অবস্থা এক নয়। তাই এক ধরনের সুপারিশ দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জমিভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করেই সার ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হবে।
একইভাবে কীটনাশকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনেক কৃষক রোগ বা পোকার আক্রমণ নিশ্চিত না হয়েও আগাম কীটনাশক স্প্রে করেন। আবার কেউ কেউ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ব্যবহার করেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি ও পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, নতুন পরিকল্পনায় কৃষকদের শেখানো হবে কখন কীটনাশক ব্যবহার প্রয়োজন এবং কখন নয়। ক্ষেতে পোকামাকড়ের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে জৈব ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার কৌশলও ব্যবহার করতে উৎসাহ দেওয়া হবে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন। প্রয়োজন হলে সরাসরি জমি পরিদর্শন করে পরামর্শ দেবেন। এতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে ৫০ বছরে কীটনাশকের বার্ষিক ব্যবহার বেড়ে ৪০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭২ সালে যেখানে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০২২ সালে তা বেড়ে ৪০ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ধান, শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে এসব কীটনাশক ব্যবহৃত হয়। শুধু গত ৫ বছরেই দেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে ৮১.৫ শতাংশ। কীটনাশকের বর্তমান বাজারের আকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আব্দুল মুঈদ বলেন, আমাদের খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ খাদ্যের উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি। তাই আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অপরিকল্পিত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মানবস্থাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে অনেক রোগবালাইয়ের জন্ম হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কৃষি অর্থনীতিবীদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সঠিক কৃষি ব্যবস্থাপনার দিকে সরকারকে জোড় দিতে হবে। সরকার যদি কৃষিকার্ডধারীদের সহায়তা দেয় তাহলে অপ্রয়োজনীয় অনেক ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন অনেকটা বৃদ্ধিপাবে। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করলে শুধু উৎপাদনই বাড়ে না, ফসলের গুণগত মানও উন্নত হয়। একই সঙ্গে মাটিরজৈব উপাদান সংরক্ষণ সহজ হয়। অন্যদিকে কীটনাশকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। আর কৃষি কার্ডের সঙ্গে মাটি পরীক্ষার তথ্য যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। একজন কৃষক কোন জমিতে কী চাষ করছেন এবং সেখানে কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, তা সহজেই নির্ধারণ করা যাবে।
সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে সার ও কীটনাশকের অপচয় কমবে। কৃষকের উৎপাদন খরচও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে দেশ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পথ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।