বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে হতশ্রী পারফরম্যান্স নিয়ে কাঁটাছেড়া করার পর নতুন উদ্যমে শুরু করার চ্যালেঞ্জ এখন ব্রাজিলের। মরক্কো ম্যাচের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সেলেসাওদের কোচ কার্লো আনচেলত্তি নাকি নতুন এক কৌশলে নেইমারদের প্রস্তুত করছেন।
বিশ্বকাপের সি গ্রুপে আগামীকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় হাইতির মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। স্কটল্যান্ড তাদের প্রথম ম্যাচে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে শীর্ষে আছে। মরক্কো ও ব্রাজিল নিজেদের ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে। ফেয়ার প্লেতে দ্বিতীয় স্থানে মরক্কো, ব্রাজিল তিনে। পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে উঠতে হলে হাইতির বিপক্ষে পুরো তিন পয়েন্ট জয়ের বিকল্প নেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে অনুশীলন সেশনগুলোতে নাকি অভিনব ছক কষছেন আনচেলত্তি।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম লেন্স জানিয়েছে, অনুশীলনে সেলেসাওয়ের খেলোয়াড়দের আলাদা করার সময়, শুরুর একাদশ ও সাইডবেঞ্চের ফুটবলারদের একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলার সময় কিংবা কৌশলগত অনুশীলনের সময় আনচেলত্তি কেবল আগামী ম্যাচের একাদশ নিয়েই পরিকল্পনা করেননি বরং তার মূল মনোযোগ ছিল আরও গভীরে দলের প্রতিটি ফুটবলার যেন একদম নিখুঁতভাবে বোঝেন যে মাঠের ভেতর পুরো দলের আসল কাজটা ঠিক কী।
মরিসটাউনে নিউইয়র্ক রেড বুলসের ট্রেনিং সেন্টারে ব্রাজিলের ক্লোজড-ডোর অনুশীলনে এই দৃশ্য বারবার দেখা গেছে। সেশনের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, যারা মূল একাদশে থাকার দৌড়ে নেই, তারাও ঠিক নিয়মিত স্টার্টারদের মতোই একই পজিশনে খেলছেন, কোচের কাছ থেকে একই ধরনের নির্দেশনা পাচ্ছেন এবং দলের মূল রণকৌশলের সাথে সমানভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটিই আনচেলত্তির কাজের চিরচেনা এবং ঐতিহাসিক এক বৈশিষ্ট্য।
এসি মিলান, চেলসি, প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি), বায়ার্ন মিউনিখ এবং রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বসেরা ক্লাবগুলোতে নিজের সফল অধ্যায়ে আনচেলত্তি এমন একজন গ্রুপ ম্যানেজার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন, যিনি পুরো স্কোয়াডের প্রতিটি সদস্যকে সবসময় যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখতে পারেন। যেসব কোচ মাঠের ফুটবলারদের একদম রোবটের মতো বা একই ধরনের যান্ত্রিক মুভমেন্টের পুনরাবৃত্তি করাতে পছন্দ করেন আনচেলত্তি ঠিক তারই বিপরীত মেরুর। ডন কার্লো খেলোয়াড়দের কোনো নির্দিষ্ট ছকে না বেঁধে, দলের সম্মিলিত ফুটবলীয় মূলনীতি শেখাতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন।
মূলত এর অর্থ হলো শুরুর একাদশে থাকা ফুটবলার আর সাইডবেঞ্চের বিকল্প, সবাই দলের একই কাঠামো বা কৌশল রপ্ত করেন। বল ছাড়া দল কীভাবে নিজেদের পজিশন ধরে রাখবে, আক্রমণ কীভাবে শুরু করবে, প্রতিপক্ষের বক্সে কোন কোন জায়গাগুলো ব্যবহার করবে এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে (ট্রানজিশন) যাওয়ার মুহূর্তে কার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—তা দলের প্রত্যেককে সমানভাবে বুঝতে হয়। মূল লক্ষ্য একটাই, ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তে কোনো ফুটবলার পরিবর্তন করা হলেও দলের সম্মিলিত ছক ও পারফরম্যান্সে যেন তার ন্যূনতম প্রভাবও না পড়ে।
তবে এখানে একটি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সবাইকে একই গেম-প্ল্যান বা ছকের ভেতর রেখে অনুশীলন করানো হলেও, আনচেলত্তি সাধারণত চান না যে প্রতিটি ফুটবলার তার ভূমিকা হুবহু একই ছাঁচে বা একইভাবে পালন করুক। বরং ব্যাপারটা একদম উল্টো। তার অধীনে কাজ করা ফুটবলাররা সবসময় আনচেলত্তির যে গুণটির কথা সবচেয়ে বেশি বলেন, তা হলো দলের মূল সিস্টেম বা কৌশলকে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে দারুণভাবে মানিয়ে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা।
ব্রাজিল জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এই ফুটবল দর্শন যেকোনো বিশ্বকাপের মঞ্চে ভাগ্যনির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বকাপের মতো সংক্ষিপ্ত টুর্নামেন্টে কার্ডের কারণে নিষেধাজ্ঞা, চোট কিংবা শারীরিক ক্লান্তি কোচদের সবসময়ই বেঞ্চের শক্তি ব্যবহারে বাধ্য করে। আর তাই আনচেলত্তি হয়তো আগেভাগেই নিশ্চিত করতে চাইছেন যেন এন্ড্রিক, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, লুইজ হেনরিকে, ইগর থিয়াগো কিংবা রায়ানের মতো তরুণরা শুরুর একাদশের খেলোয়াড়দের মতোই দলের মূল কৌশলের সাথে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেন।
এমন পরিকল্পনার উদ্দেশ্য একেবারে সরল, ম্যাচের মাঝপথে যখনই কোনো পরিবর্তনের রোডার পড়বে, তখন সেই বদলি ফুটবলারকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে নতুন কোনো ভূমিকা শেখার বাড়তি চাপ নিতে হবে না। কারণ প্রস্তুতির পুরোটা সময় জুড়ে ওই পজিশনের মুভমেন্টগুলো তিনি অনবরত অনুশীলন করেই এসেছেন। মরক্কোর বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে ফুলব্যাক পজিশনে ইবানেজ ও দগলাস সান্তোস এবং আক্রমণে ইগর থিয়াগোকে নামিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন আনচেলত্তি, যা কিছুটা ধোঁয়াশাও তৈরি করেছিল। ফিলাডেলফিয়ায় হাইতি ম্যাচের জন্যও এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড অনুশীলনে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন; পরিস্থিতি বুঝে ঠিক সময়েই তিনি তার শুরুর একাদশ চূড়ান্ত ও ঘোষণা করবেন।
দলের এই পরিকল্পনা নিয়ে ডিফেন্ডার দানিলোর বক্তব্যও একদম পরিষ্কার, প্রতিটি দলেই একটা কোর গ্রুপ বা মূল দল থাকে, যেখানে ৬, ৭ বা ৮ জন ফুটবলার নিয়মিতই স্টার্ট করেন। আর বাকি ৩ থেকে ৪ জন খেলোয়াড়কে ম্যাচ, প্রতিপক্ষ এবং রণকৌশলের ওপর ভিত্তি করে অদলবদল করা হয়। আধুনিক ফুটবলে এটাই নিয়ম, যেখানে প্রতিপক্ষ বুঝে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাতে হয়। তাই গত ম্যাচে যা ঘটেছে, যা হয়তো অনেকের কাছে একটু বেশিই মনে হয়েছে, আসলে তা খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ একটা প্রক্রিয়া।
দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ডিফেন্ডার দানিলোর শেষ কথাগুলো ছিল ঠিক এইরকম, বর্তমানে আমাদের হয়তো একটা দল আছে, যা নিশ্চিতভাবেই ৮০ ভাগ গোছানো; আর পরবর্তী ম্যাচের জন্য তা প্রায় ৭০ ভাগ চূড়ান্ত। তবে এর বাইরেও ৩ থেকে ৪ জন ফুটবলার আছেন যাদের খেলার বিষয়টি নানাবিধ কারণে এখনও অনিশ্চিত। সেটা হতে পারে কোচের সিদ্ধান্তহীনতা, কোনো ট্যাকটিক্যাল ছক, শারীরিক সমস্যা কিংবা কোচের নিজস্ব কোনো খামখেয়ালিপনা।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া ব্রাজিল। ম্যাচের আগে দল নির্বাচন নিয়ে যথারীতি রহস্য রেখে দিয়েছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। তবে অনুশীলনের ইঙ্গিত বলছে, হাইতির রক্ষণ ভাঙতে আবারও আক্রমণাত্মক ৪-২-৪ ফরমেশনে ফিরতে পারেন ইতালিয়ান এই কোচ।
শেটির সংবাদমাধ্যম গ্লোবোর এক প্রতিবেদন বলছে, ডিফেন্সে ইবানেজের জায়গায় দানিলো এবং মাঝমাঠে লুকাস পাকেতার বলে লুইজ হেনরিকেকে খেলাতে পারে একাদশে। যদিও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনা গোপন রাখছেন ব্রাজিল কোচ। দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল ম্যাগালহায়েস ও রাফিনিয়াকে নিয়েও সতর্ক ব্রাজিল শিবির। গ্যাব্রিয়েলের বাম ঊরুতে কিছুটা চোট সমস্যা রয়েছে, আর মরক্কো ম্যাচের পর পায়ে ফোস্কা পড়ার কারণে রাফিনিয়া হালকা অনুশীলন করছেন। তাদের জায়গায় অনুশীলনে লিও পেরেইরা ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিকে দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত মূল একাদশে পরিবর্তন নাও আসতে পারে। মাঝমাঠেও রয়েছে কিছু অনিশ্চয়তা। অনুশীলনে ফ্যাবিনিওকে ব্রুনো গিমারায়েসের পাশে খেলানো হয়েছে।
তবে কোচের আস্থাভাজন কাসেমিরোও দলে ফিরতে পারেন। মরক্কোর বিপক্ষে হলুদ কার্ড পাওয়ার পর বিরতির সময় তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। এদিকে দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে নেইমারও বল নিয়ে অনুশীলনে ফিরেছেন। যদিও তাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না ব্রাজিল। দলের চিকিৎসক ও কোচিং স্টাফ তার শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। গতকাল নিউ জার্সিতে শেষ অনুশীলন করে ব্রাজিল। এরপর দল যাবে ফিলাডেলফিয়ায়।