সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও পর্দা সরবরাহের দাবি ঘিরে জাতীয় সংসদে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এক সংসদ সদস্যের উত্থাপিত এ দাবিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য করলে সংসদে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মন্তব্য করেন, পার্থর বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের জন্য অসম্মানজনক হতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টি উত্থাপন করেন আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর দেশে একটি কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার মতে, বর্তমান সংসদের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো এখানে স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সংসদের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্যরা শুধু জনগণের প্রতিনিধি নন, সংসদেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে তারা সংসদের ভাবমূর্তি বহন করেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘জামায়াত এমপির ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ও পর্দা দাবি’ শিরোনামের খবরের প্রসঙ্গ টেনে পার্থ বলেন, এমন সংবাদ তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত করেছে এবং সংসদের মর্যাদার জন্যও অস্বস্তিকর।
তিনি বলেন, সংসদ হলো জনগণের সমস্যা ও দাবি তুলে ধরার জায়গা। সেখানে একজন সদস্য যদি ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা পর্দা না পাওয়ার বিষয় নিয়ে কথা বলেন, তবে তা সংসদের মর্যাদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন।
একাদশ সংসদে গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে পার্থ আরও বলেন, যখন গাড়ি ও প্লটের মতো সুবিধা ত্যাগ করা হয়েছে, তখন সংসদে মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা ওয়াশিং মেশিন নিয়ে আলোচনা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এ সময় কৌতুকের সুরে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি প্রয়োজন হয়, তিনি ব্যক্তিগতভাবে একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি ওয়াশিং মেশিনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকলে পর্দার ব্যবস্থা করার কথাও বলতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার এ বক্তব্যে সংসদে উপস্থিত সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
এরপর বিষয়টির ব্যাখ্যা দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। বাজেট অধিবেশনে বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। তিনি নিজের জন্য নয়, বরং সংসদের আবাসিক ভবনে থাকা সব সদস্যের সুবিধার বিষয়েই কথা বলেছেন।
স্পিকার আরও বলেন, বিষয়টি সংসদে না তুললেও চলত, তবে এটি কোনো গর্হিত অপরাধ নয়। সংসদ সদস্যদের আবাসন সংক্রান্ত বিষয় দেখভালের জন্য সংসদীয় কমিটি রয়েছে, সেখানে বিষয়টি আলোচনা করা যেত। ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ বা পর্দা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের কিছু নেই; এ নিয়ে বাড়াবাড়ি হলে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, পার্থ যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে কিছু দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটিও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের জন্য অসম্মানজনক হতে পারে।
এরপর স্পিকারের অনুরোধ উপেক্ষা করে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য সবার সুবিধার কথা বলেছেন এবং বিষয়টি সংসদ না করে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে নেওয়া যেত।
তিনি পার্থর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গাড়ি, প্লটসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়েছে, যা অনুচিত। সংসদে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি।
প্রসঙ্গত, বুধবার বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি জানান, ফ্ল্যাটে এখনো পর্দা লাগানো হয়নি এবং ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ সরবরাহের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরদিন এ বক্তব্য ঘিরেই সংসদে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে।