মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া মহাযজ্ঞের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ক্যাম্পাসেও।
তবে এবারের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় শুধু বর্তমান সময়ের তারকা লিওনেল মেসি কিংবা নেইমার জুনিয়র নন, ক্যাম্পাসের দেয়ালে ফিরে এসেছেন ফুটবল ইতিহাসের দুই অমর কিংবদন্তি—পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাঁদের বিশালাকৃতির গ্রাফিতি নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ফুটবলের ইতিহাস শুধু বর্তমানের নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারেরও গল্প।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলের কমনরুমের দেয়ালে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার প্রতিকৃতি এঁকেছেন ভেটেরিনারি অনুষদের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রেজওয়ানুল হক শান্ত। একই স্থানে ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট পেলের গ্রাফিতি আঁকেছেন পশুপালন অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ ফারাবি।
মেসি-নেইমারদের যুগেও পেলে ও ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই দেয়ালচিত্র দুটি বাকৃবির বিশ্বকাপ উন্মাদনায় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। প্রতিদিন বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা শাহজালাল হলে ভিড় করছেন গ্রাফিতি দুটি একনজর দেখতে এবং স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন।
ব্রাজিল সমর্থক ইমতিয়াজ ফারাবির কাছে পেলে শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তিনি বলেন, আমার কাছে পেলে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। তিনিই একমাত্র ফুটবলার, যাঁর হাতে তিনটি বিশ্বকাপ ট্রফি উঠেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হিসেবে তিনি যে কীর্তি গড়েছেন, তা আজও অনন্য।
প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার পেলের গ্রাফিতি তৈরির পেছনের শ্রমের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়।
ফারাবি বলেন, পুরো কাজটি শেষ করতে আমার প্রায় তিন দিন তিন রাত লেগেছে। প্রথম দিন স্কেচ করতেই সময় কেটে যায়। পরের দুই দিন রঙের কাজ করেছি। এখানে প্রায় ১৮ ধরনের রং ব্যবহার করা হয়েছে। ক্লাস শেষে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিদিন কাজ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সমর্থক রেজওয়ানুল হক শান্তের কাছে ম্যারাডোনা মানে আবেগ, বিদ্রোহ ও ফুটবলীয় শিল্পের প্রতীক।
তিনি বলেন, প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলে ক্যাম্পাসে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। সেই আনন্দকে আরও বাড়াতেই আমরা এই গ্রাফিতির উদ্যোগ নিই।
প্রায় ১১ ফুট উচ্চতার ম্যারাডোনার গ্রাফিতি সম্পন্ন করতে তাঁর দুই দিন সময় লেগেছে। এ কাজে জুনিয়র শিক্ষার্থীরাও সহযোগিতা করেছেন। শান্ত জানান, হলের আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অর্থায়নেই গ্রাফিতিটির যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয়েছে।
শুধু শাহজালাল হলেই সীমাবদ্ধ নয় বিশ্বকাপের এই রঙিন উন্মাদনা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হল, সোহরাওয়ার্দী হল এবং ঈশা খাঁ হলের দেয়ালেও শিক্ষার্থীরা ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বকাপের নানা অনুষঙ্গ। কোথাও স্থান পেয়েছে প্রিয় দলের পতাকা, কোথাও বর্তমান তারকাদের প্রতিকৃতি, আবার কোথাও ফুটে উঠেছে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিচ্ছবি।
তবে চলতি প্রজন্মের তারকাদের ভিড়ে পেলে ও ম্যারাডোনার এই গ্রাফিতি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে দিয়েছে এক নস্টালজিক আবহ। ফুটবলের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করা এই দুই কিংবদন্তির মুখচ্ছবি দেখে অনেক শিক্ষার্থী স্মরণ করছেন সেই সময়কে, যখন ফুটবল ছিল শিল্প, আবেগ এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।
আঁকার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন এই দুই শিক্ষার্থী। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু দেয়ালচিত্র নয়; বরং ফুটবল ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কিংবদন্তিদের গল্প পৌঁছে দেওয়ার এক সৃজনশীল প্রয়াস।
বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেও বাকৃবির এই গ্রাফিতি যেন একটি বার্তা দেয়—সময় বদলায়, নতুন তারকা আসে; কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের কিছু নাম কখনো পুরোনো হয় না। পেলে ও ম্যারাডোনা তাই আজও বেঁচে আছেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে, আর এবার তাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন বাকৃবির দেয়ালেও।