যুদ্ধের মাশুল দিয়েও কি লাভের খাতায় ইরান?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র যুদ্ধ, নৌ-অবরোধ এবং আকাশপথের ভয়াবহ হামলায় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।পারস্য উপসাগরের

2026-06-18T10:50:52+00:00
2026-06-18T11:21:14+00:00
  শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
৫ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধের মাশুল দিয়েও কি লাভের খাতায় ইরান?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ১০:৫০ এএম  আপডেট: ১৮.০৬.২০২৬ ১১:২১ এএম
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র যুদ্ধ, নৌ-অবরোধ এবং আকাশপথের ভয়াবহ হামলায় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। 

পারস্য উপসাগরের তলদেশে তলিয়ে গেছে দেশটির নৌবাহিনী, ধ্বংস হয়েছে বিমান বাহিনী, আর ভঙ্গুর অর্থনীতি ধুঁকছে চরম দুর্দশায়। তবে যুদ্ধের ধুলোবালি থিতিয়ে আসার আগেই ইরানের জন্য নিয়ে এল এক অভাবনীয় সম্ভাবনা। সমঝোতা অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি আগের চেয়েও শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার পথে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সম্বলিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে, যা সুইজারল্যান্ডে আগামী শুক্রবার চূড়ান্ত হওয়ার কথা। 

এই চুক্তির ফলে ইরানের জব্দ থাকা বিশাল অংকের অর্থ অবমুক্ত করা হবে, মিলবে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা একে ইরানের অর্থনীতির জন্য এক ‌‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন।

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি হলো ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি- তেল রপ্তানির পুনরুজ্জীবন। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার ফলে ইরান এখন তার ট্যাংকারগুলোতে ভাসমান অবস্থায় থাকা কোটি কোটি ব্যারেল তেল অবাধে বিক্রি করতে পারবে। 

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাডের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জর্জ লিওনের মতে, যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়েও ইরান প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে পারবে, যা আগে থেকে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অবৈধ পথে তেল বিক্রির জন্য ইরানকে আর চড়া মূল্যছাড় দিতে হবে না। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট আয়ের ৫০ শতাংশই আসে তেল থেকে।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের কারণে গত কয়েক মাস পারস্য উপসাগরে মার্কিন অবরোধের মুখে ইরানের তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে নতুন চুক্তির ফলে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানকে তেল পরিবহন, বিমা ও বিক্রির জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

এছাড়া, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নির্বিঘ্ন জাহাজ চলাচলের সুবিধা থাকায় প্রতি ট্যাংকার থেকে ইরান প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোল আদায় করতে পারবে, যা তাদের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, অবরোধ শেষ হওয়ার পর চলতি সপ্তাহে ইরান সফলভাবে ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ১০ হাজার কোটি (১০০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি সম্পদ অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। যদিও এর সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন তাদের জব্দকৃত সম্পদ ও তহবিলগুলো পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। 

মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ ফ্রেডরিক স্নাইডারের মতে, ইরানের জব্দ করা সম্পদের পরিমাণ ১২ হাজার ৪০০ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের মধ্যে, যা তাদের যুদ্ধপূর্ব বার্ষিক জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করলে কোনো তহবিলই ছাড় করা হবে না।

ইরানের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে প্রায় ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইসরায়েল ও মার্কিন হামলায় ইরানের ইস্পাত কারখানা ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৭ হাজার কোটি ডলার বলে দাবি করেছে তেহরান।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক উপ-পরিচালক আদনান মাজারেই জানান, এই শিল্পগুলো পুনর্গঠনে দীর্ঘ সময় ও ব্যাপক সম্পদের প্রয়োজন। 

ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এই তহবিলটি বেসরকারি উৎস থেকে সংগৃহীত হবে এবং এতে মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ইরানের আচরণ না দেখা পর্যন্ত সেখানে বড় বিনিয়োগ করতে দ্বিধা বোধ করবেন বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অর্থ হলো, ইরানের ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশ্ববাজারে অবাধে বাণিজ্য করতে পারবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো অতীতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে বড় ধরনের জরিমানার শিকার হওয়ায় এখনো লেনদেনে সতর্ক। 

আদনান মাজারেই মনে করেন, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ থেকে নির্দিষ্ট গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তাছাড়া, এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের ওপরও কিছুটা নির্ভর করছে।

বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতির হার ৫০ শতাংশের ওপরে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই চুক্তি ইরানের অর্থনীতির চাকা সচল করতে পারলেও, দেশটির অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এখনো বড় বাধা। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি সঠিকভাবে নজরদারি না করা হয়, তবে এই বিপুল অর্থ দেশের উন্নয়নের পরিবর্তে আবারও উগ্রবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরিতে ব্যয় হতে পারে, যা প্রতিরোধ করতেই মূলত যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। 

ইতিহাসের দিকে তাকালে সাধারণ ইরানিদের এই সুবিধার সুফল পাওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে। সূত্র: সিএনএন


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: