রাজধানীতে ফ্ল্যাটের দাম নাগালের বাহিরে। তারমধ্যে রড, সিমেন্ট, ক্যাবলসহ সব ধরনের আবাসন খাত সংশ্লিষ্ট নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছেই।
এছাড়া, নতুন ড্যাপে ঘোষিত ফ্লোর-এরিয়া রেশিও বা আয়তন অনুপাতে তলা কমানোয় ঢাকায় বেশিরভাগ ভবনের অনুমোদন হচ্ছে চার থেকে পাঁচ তলা। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ খরচ পড়ছে বেশি। এতে ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় চাপে রয়েছেন দেশের আবাসন উদ্যোক্তারা। তারা নানাভাবে চেষ্টা করেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এরমমধ্যে সরকার জাতীয় বাজেটে নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপ এবং জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের উপর নতুন গেইন ট্যাক্স আরোপ করেছে।
বিশেষ করে রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপ নির্মাণ ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাটের মূল্য ও সাধারণ ক্রেতা এবং এরসাথে জড়িত প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের ওপর। এতে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে আবাসন খাত।
এ সংকট নিরসনে নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর প্রত্যাহার, ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। এ দাবি না মানলে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়েছেন রিহ্যাব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো আবাসন খাতে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি আরো দশ বছর আগে যেখানে প্রায় দেড় হাজার ইউনিট ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, সেখানে অনেক প্রকল্পে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার।
বিশেষ করে বসুন্ধরা, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অন্যান্য এলাকায় অনেকটা একই রকম বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় নতুন কর ও শুল্ক ও গেইন ট্যাক্স আরোপ এ খাত আরো অবনতির দিকে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর নির্মাণসামগ্রীর দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার টাইলস বিক্রি হতো, এখন সেখানে দিনে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন ক্রেতাও পাওয়া যায় না। এতে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করতে পারছে না দোকান মালিকরা। তারা বলছেন, আগের মতো আবাসন নির্মাণ না হওয়ায় এমন অবস্থার সষ্টি হয়েছে। এখন নতুন করে এ খাতে কর বসানোয় এ খাতের ব্যবসা আরো অবনতির দিকে যাবে।
জানা গেছে, জাতীয় বাজেটে ইট ও টাইলস তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, পাইপ উৎপাদনের উপকরণ, বোর্ড তৈরির উপাদান এবং আসবাব শিল্পের প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্কহার বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ঘুমানোর তোশক বা ম্যাট্রেস তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রস্তুত পণ্যের ওপরও অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়েছে। তার বাহিরে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে এ খাত আরো সংকটে পড়বে বলে মনে করছে রিহ্যাব।
জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে রিহ্যাব এবং এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান নগরমুখী জনগোষ্ঠীর আবাসন চাহিদা পূরণে বর্তমানে রিহ্যাবের প্রায় ১৮০০ ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত আবাসন ও নগর উন্নয়নে অবদান রেখে চলছে।
তাছাড়া, আবাসন শিল্পের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাঁচ, বৈদ্যুতিক পণ্য, আসবাবপত্র, পরিবহন, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবাসহ প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত।
ফলে আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে গতিশীল করে। জিডিপিতে পুরো নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। তাছাড়া, বর্তমানে আবাসন খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
পাশাপাশি আবাসিক, বাণিজ্যিক ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নেও এ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এ খাত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছে আবাসন খাত।
রিহ্যাবের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছে না। চলমান প্রকল্পও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বিশেষ নীতি সহায়তা ও স্বল্প সুদে গৃহঋণের সুযোগ। কিন্তু সরকার তা না করে নতুন করে এখাতে কর বসানোসহ গেইন ট্যাক্স আরোপে নাখোশ আবাসন খাতের সাথে জড়িতরা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এ খাতকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
আবাসন খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্প উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে নতুন কর আরোপসহ সব সংকট দ্রুত কাটানো প্রয়োজন। না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এদিকে গতকাল সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
এছাড়া, নির্মাণসমাগ্রীর ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব বহাল থাকলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমবে এবং ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম রিজিয়ন) মোহাম্মদ মুরশিদুল হাসান প্রমুখ।
আবাসন খাত বর্তমানে ক্রেতা সংকট, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়ন সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে ড. আলী আফজাল বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর আরোপ ও উচ্চ নিবন্ধন ব্যয় বহাল রাখা হলে খাতটি আরও সংকটে পড়বে।
ড. আলী আফজাল বলেন, বর্তমানে জমির মালিককে দেওয়া সাইনিং মানির ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এর পাশাপাশি ডেভেলপারের নির্মিত ফ্ল্যাটের ওপরও জমির মালিককে ১৫ শতাংশ কর দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এতে যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) প্রকল্প নিরুৎসাহিত হবে, নতুন প্রকল্প কমে যাবে এবং বিনিয়োগ হ্রাস পাবে।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর প্রত্যাহার, নিবন্ধন ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং আবাসন খাতের জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমাদের দাবি না মানলে আন্দোলনের মাধ্যেমে দাবি আদায় করা হবে বলেও তিনি জানান।