২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গ্রুপ আই এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে আফ্রিকার পরাশক্তি সেনেগালের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে অন্যতম হট ফেভারিট ফ্রান্স। ফ্রান্সকে অনেকেই এবারের টুর্নামেন্টের অন্যতম হট ফেভারিট মানছেন। তাদের স্কোয়াড গভীরতা এই টুর্নামেন্টে সবার চেয়ে বেশি। কোচ দিদিয়ে দেশম নিজেই জানিয়েছেন এটি তার শেষ বিশ্বকাপ।
তিনি ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন কোচ হিসেবে। এবার তিনি দ্বিতীয়বার সেই ট্রফি জিততে চান। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি মাঠে নামবেন। ফ্রান্স ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল। আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে হেরেছিল। তারা পরপর দুই বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে।
এই অভিজ্ঞতা তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের খেলার ধরন অসাধারণ, শক্ত রক্ষণের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। শারীরিক শক্তি, গতি আর বিশ্বমানের তারকাদের মিশেলে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। ধৈর্যশীল খেলা কিংবা ঝড়ো আক্রমণ, দুটোতেই তারা সমান পারদর্শী। সেনেগাল এবার আফ্রিকার হয়ে সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক। লায়ন্স অব টেরাঙ্গা নামে পরিচিত এই দলটি ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া।
শারীরিক শক্তি, কৌশলগত শৃঙ্খলা আর আক্রমণের গতি, সবকিছুর চমৎকার সমন্বয় রয়েছে তাদের মধ্যে। আর কোনো সন্তুষ্টি নয়, এবার তারা সত্যিকারের শিরোপার লড়াইয়ে নামতে চায়। আলিউ সিসের নেতৃত্বে দলটি মাঠের প্রতিটি অংশেই শক্তিশালী।
তবে মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ফরাসি শিবিরে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ দিতে নারাজ দলটির অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। ফেভারিটের তকমা গায়ে লাগিয়ে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড।
এই ম্যাচের পেছনে জড়িয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ২০০২ সালের বিশ্বকাপের সেই উদ্বোধনী ম্যাচের কথা ফুটবলপ্রেমীদের হয়তো এখনো মনে আছে, যেখানে তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল সেনেগাল।
২৬ বছর পর বিশ্বমঞ্চে সেই একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার আগে এমবাপে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মাঠে নিজেদের সেরাটা প্রমাণ না করে অহংকার দেখালে তার ফল হবে মারাত্মক।
সংবাদ সম্মেলনে সেনেগাল ম্যাচ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে এমবাপে বলেন, সেনেগালের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ থেকেই আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যদি আগেই ভেবে বসি যে আমরাই বিশ্বকাপ জিততে যাচ্ছি, তবে সেনেগালিজরা আমাদের ওপর চড়াও হবে এবং খুব দ্রুতই আমাদের আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনবে।
পন্ডিত ও ফুটবল বোদ্ধাদের দেওয়া ফেভারিট তকমাটিকে একটি সম্ভাব্য ফাঁদ হিসেবে দেখছেন ফরাসি অধিনায়ক। তিনি বলেন, ফেভারিট হওয়াটা বিপজ্জনক নয় যদি আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। কারণ দিনশেষে কেবল জয়টাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি ফ্রান্সের অনেক প্রতিভাবান দল দেখেছি, যারা শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিততে পারেনি।
২০১৮ ও ২০২২ সালের পর এটি কিলিয়ার এমবাপের ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ হলেও, অধিনায়ক হিসেবে এটিই তার প্রথম বিশ্বমঞ্চ। দিদিয়ের দেশমের অধীনে দলে নিজের ভূমিকা কীভাবে বদলে গেছে, তা নিয়ে এই ফরোয়ার্ড বলেন, শুরুতে আমি ছিলাম দলের তরুণ প্রতিভা, কেকের ওপর চেরি ফলের মতো।
এরপর আমি হয়ে উঠলাম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, সেই তারকা যাকে কেন্দ্র করে সবাই পরিকল্পনা সাজায়। তখন মানুষ আমার যত্ন নিত। আর এখন, ২০২৬ সালে এসে আমিই সেই ব্যক্তি, যাকে দলের সবার যত্ন নিতে হবে, সবাইকে আগলে রাখতে হবে।
এটি ২০০২ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের কথা মনে করিয়ে দেবে, যখন তৎকালীন নবাগত সেনেগাল তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়েছিল।
যেহেতু ফ্রান্সের প্রায় সব খেলোয়াড়ই তখন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ছিলেন, তাই এই বলে ঠাট্টা শুরু হয়েছিল যে সেনেগালের প্রথম দল দ্বিতীয় দলকে হারিয়েছে। এরপর ফ্রান্স আরও দুটি ম্যাচ হেরে বিদায় নেয়। সেনেগাল শেষ ষোলোতে সুইডেনকে হারায় এবং অবশেষে কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের কাছে হেরে যায়।
সেনেগাল দলে এমন সব প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছেন, যারা নকআউট পর্বে অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন। মরক্কো যে এবার আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতেছে, তা কিন্তু এই সেনেগালের বিপক্ষে ফাইনাল খেলেই। অতিরিক্ত সময়ে রেফারির কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগাল দল একযোগে মাঠ বর্জন করে। যদিও পেনাল্টি শুটআউটে ম্যাচটি সেনেগালই জিতেছিল। এর কয়েক মাস পর, আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশন রায় দেয় যে, মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ায় সেনেগাল আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচটি ফরফিট বা হাতছাড়া করেছে। ফলে মরক্কোকে ৩-০ ব্যবধানে জয়ী ঘোষণা করা হয়।
ফুটবল বিশ্বকাপের আসন্ন আসরসহ এখন পর্যন্ত মেগা টুর্নামেন্টে কেবল পাঁচ বারই খেলার সুযোগ পেয়েছে আফ্রিকান দল সেনেগাল। সেরা অর্জন বলতে একবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। সেই দলটাই এবার স্বপ্ন বুনছে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ঘরে তোলার। অবশ্য সেই স্বপ্ন দেখার যথেষ্ট যুক্তিও আছে তাদের।
আসন্ন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেই টুর্নামেন্টে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। নিজেদের খেলা সর্বশেষ ১০ ম্যাচের মধ্যে তারা হেরেছে কেবল একটিতে। আফ্রিকা সেরার টুর্নামেন্ট আফকনের মুকুটও জিতেছিল তারাই। তবে টুর্নামেন্ট জয়ের অনেকদিন পর আফকন সেই ম্যাচের বিজয়ী ঘোষণা করে মরক্কোকে।
ওই টুর্নামেন্ট চলাকালে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১২ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে চলে এসেছিল সেনেগাল। এখন আছে ১৫ নম্বরে। সব মিলিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে সেনেগাল।
সেনেগালের এই প্রজন্মকে অনেকেই বলছেন তাদের ইতিহাসের সোনালী প্রজন্ম। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের ডার্ক হর্স খেতাব পেতে শুরু করেছে তারা। দলে আছেন সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ইদ্রিসা গানা গেয়ে এবং গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দি। তাদের অনেকেরই এটা শেষ বিশ্বকাপ। তাদের জন্যও এটি নিজেদের মেলে ধরার শেষ সুযোগ।
রাকঢাক না রেখে তাই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বোনার কথা জানিয়ে দিয়েছেন সেনেগালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচ পাপে থিয়াও।
সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা শুধু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য যাচ্ছি না। সেনেগাল এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বজয়। আমাদের সেই প্রতিভা এবং বিশ্বাস আছে। আমাদের এই সোনালী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য এটাই সেরা সময় আফ্রিকার ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার।
দেশটির সাম্প্রতিক সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা সেনেগালি বংশোদ্ভূত তরুণ প্রতিভাদের দলে ভেড়ানো।
ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলা পিএসজির ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার ইব্রাহিম এমবায়ে এবং চেলসির ২০ বছর বয়সী ডিফেন্ডার মামাদু সারের মতো প্রতিভাদের ফ্রান্সের রাডার থেকে ছিনিয়ে এনে সেনেগাল জাতীয় দলে খেলিয়েছে দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
তবে সেনেগালের এই বড় দল হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আফ্রিকার ফুটবলের এক নির্মম আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার গল্পও। মাত্র ২ কোটি জনসংখ্যার দেশ হয়েও সেনেগাল থেকে যেভাবে বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসছে, বিস্ময়কর।
খেলোয়াড় এবং কোচ উভয় হিসেবেই বিশ্বকাপজয়ী দিদিয়ের দেশম ২০২৬ বিশ্বকাপের পর ফরাসি জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদ জিনেদিন জিদানের কাছে হস্তান্তর করবেন।
কোচ দিদিয়ের দেশম ফরাসি জাতীয় দলকে বিশ্বকাপ ম্যাচে ১৪টি জয় এনে দিয়েছেন এবং গ্রুপপর্বে শতভাগ জয় পেলে তিনি কিংবদন্তি হেলমুট শনের ১৬টি জয়ের রেকর্ডটি ছাড়িয়ে যাবেন। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ১-২ গোলের প্রীতি ম্যাচে পরাজয় ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু সন্দেহ তৈরি করেছিল। তবে, আক্রমণে মাইকেল ওলিসের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ফরাসি দলটি চার দিন পরেই উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয় নিয়ে ছন্দে ফেরে।
কোনো পরাজয় ছাড়াই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি, সেনেগাল টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। এর আগে ২০২২ সালে তারা শেষ ষোলো থেকে এবং তারপর রাশিয়ায় গ্রুপপর্ব থেকেই বাদ পড়েছিল। শক্তিশালী স্কোয়াড, শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং দিদিয়ের দেশামের মতো একজন অভিজ্ঞ কোচ থাকায়, ফরাসি জাতীয় দল ইতিহাসে তাদের তৃতীয় শিরোপার স্বপ্ন দেখার সব কারণ নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রবেশ করছে।
ফরাসি জাতীয় দলের হয়ে ৫৬টি গোল নিয়ে বিশ্বকাপে প্রবেশ করেন কিলিয়ান এমবাপে, কাতারে অলিভিয়ের জিরুদের গড়া সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি স্পর্শ করতে তার আর মাত্র একটি গোল তার প্রয়োজন।
খেলোয়াড় যাদের দিকে নজর রাখবেন
সাদিও মানে (সেনেগাল) : সেনেগালের আবেগের প্রতীক। আগের বিশ্বকাপে চোটের কারণে খেলতে না পারার দুঃখ এবার ঘোচাতে চান তিনি। সৌদি লিগে খেলে নিজেকে নতুন করে সাজিয়েছেন। এখন তিনি শুধু গোল করেন না, আক্রমণের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই তার নেতৃত্ব আর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কিলিয়ান এমবাপে (ফ্রান্স) : ফ্রান্সের অধিনায়ক এখন আর শুধু তরুণ প্রতিভা নন। দলের কেন্দ্রবিন্দু এবং নেতা। বাঁ-পাশ থেকে ভেতরে ঢুকে আসা তার স্বাভাবিক খেলা। গতি আর ফিনিশিংয়ের অসাধারণ মিশ্রণ তাকে বিশ্বের সেরাদের একজন করে তুলেছে। আরেকটি বিশ্বকাপ জয় তার লিগ্যাসিকে অমর করে রাখবে। ফ্রান্সের আক্রমণের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলটির সাইডবেঞ্চ।
প্রথম একাদশ ক্লান্ত হলে দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়রা এসেও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এই বিশেষ বিলাসিতা ফ্রান্সকে আর সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে বৈকি।
সম্ভাব্য একাদশ (ফ্রান্স) : মিয়াঁন; কুন্দে, সালিবা, উপামেকানো, টি. হের্নান্দেজ; চুয়ামেনি, রাবিও; ওলিসে, দেম্বেলে, দু; এমবাপে।
সম্ভাব্য একাদশ (সেনেগাল) : মেন্দি; দিয়াত্তা, কুলিবালি, নিয়াখাতে, দিউফ; ডায়ারা, ইদ্রিসা গেই, পাপা গেই; এনদিয়াই, জ্যাকসন, মানে।