সিংহভাগ সুবিধা ধনীদের পকেটে, নীতি বদলের তাগিদ

আজহারুল হক ফরাজী ​

জাতীয়

বাংলাদেশে প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে

2026-06-16T10:55:44+00:00
2026-06-16T11:33:01+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
বড় বাজেটেও ধুঁকছে কৃষি
সিংহভাগ সুবিধা ধনীদের পকেটে, নীতি বদলের তাগিদ
আজহারুল হক ফরাজী ​
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম  আপডেট: ১৬.০৬.২০২৬ ১১:৩৩ এএম
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে ধীর হয়ে পড়েছে। 

একই সঙ্গে দুর্বল হয়েছে উৎপাদনশীলতা এবং স্থবির হয়ে পড়েছে উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ। এমন পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে দেশের কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের ধরনে আমূল পরিবর্তনের জোর তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। 

সোমবার (১৫ জুন) ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘রেপারপাসিং এগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক এক বিশেষ প্রতিবেদনে সংস্থাটি এই বিস্ফোরক তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরে।

​ভর্তুকির সিংহভাগ ধনীদের পকেটে : বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষি সহায়তার সবচেয়ে বড় খাত হলো সার ভর্তুকি, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাস করছে। এই বিপুল ভর্তুকি উৎপাদন ধরে রাখতে এবং সামষ্টিক মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করলেও এর সুবিধা বণ্টনে চরম বৈষম্য দেখা গেছে। যেহেতু এই ভর্তুকি সরাসরি সার ক্রয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে, তাই বড় জমির মালিক বা ধনী কৃষকরাই এর সিংহভাগ সুবিধা পাচ্ছেন। 

দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ ধনী কৃষক মোট সার ভর্তুকির প্রায় ৫০ শতাংশ (অর্ধেক) সুবিধা ভোগ করছেন। পক্ষান্তরে, তলানির ৪০ শতাংশ দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ১৫ শতাংশ সুবিধা। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কৃষি চালিকাশক্তি। তবে জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো বিষয়গুলো বর্তমান নীতি ও ব্যয়ের ঘাটতিগুলোকে সামনে এনেছে।

​প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের কৃষকদের মধ্যে সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তীব্র ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করছেন। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করে সঠিক নিয়মে সার ব্যবহার করা গেলে ফসলের ফলন ও উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

​ধানের পেছনেই ৮০% বরাদ্দ, থমকে আছে বহুমুখীকরণ : বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশের মানুষের খাদ্য তালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, আমিষ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সরকারি ব্যয় ও নীতি মূলত ঐতিহ্যগত ধান উৎপাদনের দিকেই বেশি ঝুঁকে রয়েছে, যা কৃষির আধুনিকীকরণ ও বহুমুখীকরণকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

​বর্তমানে দেশের মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং কৃষি সহায়তার মোট ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যায় শুধু ধান চাষের পেছনে। 

অথচ গবাদি পশু, মৎস্য, শাকসবজি এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো উচ্চ-মূল্যের উপখাতগুলো মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অনেক বেশি সম্ভাবনাময় হলেও এগুলো প্রয়োজনীয় তহবিল পাচ্ছে না। গবেষণা, কৃষি পরামর্শ সেবা, আধুনিক সেচ এবং বাজারের সহজলভ্যতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বাজেটের অভাবে অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে।

​সংকট উত্তরণে বিশ্বব্যাংকের ৩ দফা সুপারিশ : এই বৈষম্য ও উৎপাদনশীলতার সংকট কাটাতে বিশ্বব্যাংক সুনির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমিক সংস্কারের রোডম্যাপ দিয়েছে :

​১. ‘কৃষক কার্ড’ ও ই-ভাউচার চালু : স্বল্পমেয়াদে দ্রুত দেশব্যাপী মাটির পরীক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘ই-ভাউচার’ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে হবে, যাতে সরকারি ভর্তুকির টাকা সরাসরি দরিদ্র এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকদের হাতে পৌঁছায়।

​২. দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন : সারের পেছনে অন্ধের মতো বিপুল অর্থ অপচয় না করে, সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া উদ্বৃত্ত রাজস্ব কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে।

​৩. বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় : বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক মনসুর আহমেদ বলেন, সার ভর্তুকির নকশা এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা গেলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও প্রকৃত কৃষকের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা যাবে।

​অর্থনীতিক বিশ্লেষকদের মনে করেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংকটের মুখে বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনটি নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। শুধুমাত্র ধানকেন্দ্রিক ঐতিহ্যগত কৃষিভাবনা থেকে বের হয়ে উচ্চ-মূল্যের আধুনিক কৃষিতে রূপান্তর না ঘটলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই করা কঠিন হয়ে পড়বে।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: