ইন্টারপোলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে।
সেই প্রত্যর্পণ আবেদন করার পাশাপাশি অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সেরে দ্রুতই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
দেশে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি রোববার সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমদকে সেখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে আটক আছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীরকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করা হয়। সেই নোটিসের ভিত্তিতেই আমিরাতের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর পরের প্রক্রিয়া তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএইর ফেডারেল আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে।
প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানো হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিসে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওই নোটিস প্রকাশ করা হয় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল। নোটিসের কন্ট্রোল নম্বর এ-৫১৭৪/৪-২০২৫।
সেখানে তাকে ‘ফিউজিটিভ ওয়ান্টেড ফর প্রসিকিউশন’ বা বিচারের জন্য পলাতক আসামি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সতর্কতামূলক অংশে তার নামের পাশে ‘ডেঞ্জারাস’ এবং ‘এস্কেপ রিস্ক’ লেখা রয়েছে।
রেড নোটিসে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে বেনজির ১১ কোটি ৪২ লাখ ২৭ হাজার ৩৩১ টাকার সম্পদের তথ্য দেন। এর মধ্যে ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদ ছিল।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদ গোপনের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়।
এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
চলতি বছরের ৩ মে ওই মামলায় অভিযোগ গঠন করে সাবেক আইজিটি বেনজীরের বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার একটি আাদলত।
ইন্টারপোলের রেড নোটিসে বলা হয়, তদন্তে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারার অপরাধের বিষয়ও উঠে এসেছে।
ওই মামলায় ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতেই পরে রেড নোটিস জারি করা হয়।
অবৈধ সম্পদের মামলার পাশাপাশি পাসপোর্ট জালিয়াতির এক মামলাতেও বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর দায়ের করা ওই মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারা যুক্ত করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের আবেদনে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়, ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি চাকরিজীবী হয়েও বেনজির একাধিকবার নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে পাসপোর্টের আবেদন করেন।
বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই আবেদন করে তিনি ‘প্রতারণামূলক’ উপায়ে পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।
বেনজীর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহায়তায় পরোয়ানা কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয় আদালতের ওই আদেশে।
দুদকের এজাহারে যা বলা হয়েছিল : পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলার এজাহারে দুদক বলেছিল, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও বেনজির আহমদ বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।
দুদকের ভাষ্য, পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য তিনি “জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার” আশ্রয় নেন এবং বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই পাসপোর্টের আবেদন করেন।
এজাহারে বলা হয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার সরকারি পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়া পরস্পরের যোগসাজশে অপরাধমূলক অসদাচরণের মাধ্যমে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করেন।
ওই মামলায় বেনজীর ছাড়াও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মো. ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার মোছা. সাহেনা হক এবং পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করা হয়।
মামলা হওয়ার পর দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল।
সেসব যাচাই প্রক্রিয়াতে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তারা সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেননি। এই অপরাধমূলক অসদাচরণের সঙ্গে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জেনে-শুনে এই কাজ করেছেন।
বেনজীর কেন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সাধারণ পাসপোর্ট নিয়েছিলেন–এমন প্রশ্নে আক্তার হোসেন বলেছিলেন, তিনি কী উদ্দেশ্যে বা কী কারণে তার পরিচয় গোপন করেছেন তা আমাদের জানা নেই। মামলার তদন্তকালে তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয় উদঘাটনের চেষ্টা করবেন।
বেনজীর আহমদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে ২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে। এরপর দুদক অনুসন্ধান শুরু করে।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিকবার তলব করা হলেও বেনজীর, তার স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে দুদকে হাজির হননি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীর, তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক।
এরপর ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাচারের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের এফডিআর হিসাব মেয়াদপূর্তির আগেই নগদায়ন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়। সেই অর্থের গ্রহণযোগ্য কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
এজাহারে বলা হয়, বেনজীর র্যাবের মহাপরিচালক ও পুলিশের আইজিপিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে এই অর্থ অর্জন করেছেন বলে দুদকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
দুদক বলছে, অর্থ উত্তোলনের পর আসামিরা বিদেশে চলে যান। ফলে নগদে উত্তোলিত অপরাধলব্ধ অর্থের প্রকৃতি, উৎস, অবস্থান, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গোপন করে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেনজির আহমদ। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান।
তাকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তিনি বলেন, এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
বেনজীরের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আসার পর দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে দুদকের করা দুটি মামলার তথ্য ইন্টারপোলে পাঠানো হয়েছিল।
একটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা, আরেকটি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির আবেদন করেছিলেন। আদালতের আদেশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়।
আকতারুল ইসলাম বলেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় ইতোমধ্যে বিচার শুরু হয়েছে। পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে যা বলেছেন, সেই প্রক্রিয়া অনুযায়ীই পরবর্তী পদক্ষেপ হবে। কাউকে দেশে ফিরিয়ে আনা বা হস্তান্তরের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং ইন্টারপোলের প্রচলিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়।