যুদ্ধবিগ্রহ, চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতা আর ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির দমবন্ধ করা এই সময়ে ফুটবল বিশ্বকাপ যেন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি।
দৈনন্দিন জীবনের সব ক্লান্তি, হতাশা আর দুশ্চিন্তা দূরে ঠেলে এক মাসের জন্য পুরো বিশ্ব আবারও বুঁদ হতে যাচ্ছে বল পায়ে মাঠের জাদুতে।
ল্যাটিন আমেরিকার অলিগলি থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল সবখানেই প্রিয় দল আর তারকা খেলোয়াড়দের সমর্থনে গলা ফাটাতে প্রস্তুত কোটি কোটি ভক্ত।
তবে ২০২৬ সালের আসন্ন বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের এই বাঁধভাঙা উন্মাদনার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু বড়সড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের আসরটি হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন।
প্রথমবারের মতো ৩২ দলের বদলে ৪৮টি দেশ এই বৈশ্বিক মহারণে অংশ নিতে যাচ্ছে। দল বাড়ার কারণে মোট ম্যাচের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টিতে। ছোট ও মাঝারি মানের দলগুলোর জন্য এটি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণের এক অভাবনীয় সুযোগ।
কিন্তু এই বিশালত্বের পাশাপাশি সমর্থকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে অতিরিক্ত যাতায়াত ব্যয়, তিনটি ভিন্ন দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব ও আনুষঙ্গিক নানা ভোগান্তি।
ভিসা প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তা : বিশ্বকাপের অন্যতম মূল আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ি ভিসা নীতির কারণে শুরুতেই বড়সড় হোঁচট খাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমর্থকরা।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য মার্কিন ভিসা পাওয়া একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। অনেক দেশে ভিসা ইন্টারভিউয়ের জন্যই মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।
ভিসা পাওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া এই প্রবল অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেরই গ্যালারিতে বসে সরাসরি খেলা দেখার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার পথে। আগের রাশিয়া বা কাতার বিশ্বকাপে ফ্যান আইডি বা সহজ ভিসা প্রক্রিয়ার যে সুবিধা ছিল, এবার সেটি না থাকায় হতাশ সাধারণ ফুটবল পর্যটকরা।
এছাড়া কানাডা ও মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও ইমিগ্রেশন নিয়মকানুন বেশ কড়াকড়ি, যা আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দূরত্বের ধকল ও খরচের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি : আগের যেকোনো আসরকে ছাড়িয়ে এবারের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইভেন্টগুলোর একটি।
তিন দেশের ১৬টি ভিন্ন ভিন্ন শহরে ছড়ানো এই আসর যাতায়ত, আবাসন ও আনুসাঙ্গিক আয়োজনের দিক থেকেও এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুর দূরত্ব এতটাই বেশি যে, সড়কপথে যাতায়াত করা প্রায় অসম্ভব। নিউইয়র্ক থেকে লসঅ্যাঞ্জেলেস কিংবা টরন্টো থেকে মেক্সিকো সিটিতে যাওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ভাড়াও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে হোটেলের বুকিং, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত খরচ কিংবা ম্যাচের টিকিট—সবকিছুরই দাম এবার আকাশচুম্বী। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে আবাসনের তীব্র সংকট; এয়ারবিএনবি বা সাধারণ মোটেলগুলোর ভাড়াও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বেশ কিছু স্টেডিয়াম এলাকায় খেলা চলাকালীন শুধু গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যই সমর্থকদের কয়েকশ থেকে হাজার ডলার পর্যন্ত গুনতে হতে পারে!
ফুটবল প্রেমের জয় : সব মিলিয়ে, পরিসরের দিক থেকে সবচেয়ে বড় হলেও, সার্বিক ব্যাবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় এটি সাধারণ সমর্থকদের জন্য সবচেয়ে জটিল ও খরুচে একটি আসর হিসেবেই আখ্যা পাচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন টাইম জোনে খেলা হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের টিভি দর্শকদেরও মানিয়ে নিতে হবে নতুন সূচির সঙ্গে।
তবে এতসব শঙ্কা, ভোগান্তি আর পাহাড়সম খরচের হিসাব-নিকাশও হয়তো দিনশেষে ফুটবল উন্মাদনাকে আটকে রাখতে পারবে না।
ইতিহাস সাক্ষী, ফুটবলের আবেদন সবসময়ই সব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে। শত বাধা পেরিয়ে ফুটবলের প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসার টানেই শেষ পর্যন্ত গ্যালারিতে ঢল নামবে কোটি মানুষের, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মাঠের লড়াই যখন শুরু হবে, তখন গ্যালারির গর্জনই প্রমাণ করবে, শত প্রতিকূলতাও ফুটবলের এই বিশ্বজনীন উৎসবকে ম্লান করতে পারে না।