দেশজুড়ে যেন আবারও রক্তাক্ত হয়ে উঠছে জনপথ। একের পর এক খুন, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গুলি করে হত্যাকান্ড, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ঘোষণা থাকলেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় প্রতিদিনই হত্যার খবর আসছে। শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, হত্যাকান্ডের ধরন ও নির্মমতাও জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকে রাজনৈতিক বিরোধ, সব ক্ষেত্রেই সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত সাতজন হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক সাবেক নেতাকে খুন, পাবনায় গুলি ও কুপিয়ে দুইজনকে হত্যা, ময়মনসিংহে কলেজছাত্রকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা, যশোরে কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় রাজমিস্ত্রিকে কুপিয়ে হত্যা এবং মানিকগঞ্জের হরিরামপুর মাকে ধারালো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে খুনের ঘটনা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাজধানীর বুকে রাজনৈতিক বিরোধে রক্তপাত : রাজধানীর রমনার মৌচাক এলাকায় সোমবার রাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, আনারকলি মার্কেটের সামনে একটি সালিশ বৈঠকে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন। বুকে ছুরিকাঘাতের পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্টার সন্দেহে যুবদল নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার এবং থানা কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশ ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহসহ তদন্ত শুরু করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় আধিপত্যের রাজনীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
পাবনায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই খুন : পাবনায় একই দিনে পৃথক দুই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই ব্যক্তি। সন্ধ্যায় পৌর এলাকার জামিয়া আশরাফিয়া মাদ্রাসার সামনে গুলিতে নিহত হন আলী হোসেন ওরফে ঠাকুর। তিনি তার সন্তানকে মাদ্রাসায় পৌঁছে দিতে গেলে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বে একাধিক মামলা ছিল এবং তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
একই দিন বিকেলে পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার পেছনে ছুরিকাঘাতে নিহত হন কলেজছাত্র মনিরুল ইসলাম। বাস থেকে নেমে শহরে প্রবেশের সময় এক যুবকের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের জেরে এ হত্যাকান্ড ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযুক্ত একজনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে।
এই দুটি ঘটনা দেখাচ্ছে, ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে শুরু করে পুরনো শত্রুতা, সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।
গফরগাঁওয়ে কলেজছাত্রকে ঘিরে হামলা : ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে নাহিয়ান রবিন নামে এক কলেজছাত্রকে বাসার কাছেই পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্ধু শাকিবুল হাসানকে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন রবিন। পথে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত তাদের গতিরোধ করে। শাকিবুল পালাতে সক্ষম হলেও রবিনকে ধরে লোহার রড দিয়ে মারধর এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিতভাবে হামলাটি চালানো হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে এবং হামলার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করছে।
মানিকগঞ্জের মাকে কুপিয়ে খুন : মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নে মাকে ধারালো বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে রোকেয়া আক্তার।
গতকাল বেলা সোয়া ১১টার দিকে হরিরামপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের মধ্য ধোবুরীয়া এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটেছে। নিহত রিজিয়া বেগম (৯৮) হরিরামপুর উপজেলার মধ্যে ধোবুরীয়া গ্রামের মৃত আব্দুস সোবহানের স্ত্রী।
যশোরে প্রতিবাদের মূল্য জীবন : যশোরের মনিরামপুরে ইনামুল হোসেন নামে এক রাজমিস্ত্রিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, এক স্কুলছাত্রীকে দেওয়া আপত্তিকর প্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্তরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।
স্বজনরা জানান, স্থানীয় এক তরুণের বিরুদ্ধে কুপ্রস্তাবের অভিযোগ জানানো হলে সে ক্ষুব্ধ হয়ে হত্যার হুমকি দেয়। পরে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ইনামুলের ওপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি সামাজিক অবক্ষয় ও নারী হয়রানির প্রতিবাদকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
১০০ দিনে ৬০৫ খুন, পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক : সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বরাতে ‘১০০ দিনে ৬০৫টি খুন’ শিরোনামে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, উপস্থাপিত তথ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬০৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাসে; এটি ১০০ দিনের হিসাব নয়।
পুলিশের বিশ্লেষণে দেখা যায়, নথিভুক্ত হত্যাকান্ডের মধ্যে ৩৩৬টি ঘটেছে পূর্বশত্রুতার জেরে। পারিবারিক কলহে ১৪৬টি, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক বিরোধে ৬৯টি, আকস্মিক আঘাতে ১৯টি এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৯টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।
রাজনৈতিক কারণে হত্যাকান্ডের সংখ্যা তিনটি বলে দাবি করেছে পুলিশ।
শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাড়ছে সামগ্রিক উদ্বেগ : অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যাকান্ডের ধরনে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, অধিকাংশ হত্যাকান্ডে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ দ্রুত সহিংস রূপ নিচ্ছে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধের সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারী ও শিশু হত্যা, পারিবারিক হত্যাকান্ড, চরমপন্থি সংশ্লিষ্ট সহিংসতা এবং প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
পাবনায় কিশোরীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার, গাজীপুরে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যার মতো ঘটনাগুলোও জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, অধিকাংশ সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং পুরনো শত্রুতার বিষয়গুলো কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, অপরাধের ধরন ও বিস্তৃতি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে হত্যাসহ যে কোনো ধরনের অপরাধ দমনে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল হত্যার পর অপরাধী গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় হত্যাকান্ডের এই ধারাবাহিকতা জননিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
আতঙ্কের নাম অনিশ্চয়তা : দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকান্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলেছে। যে কোনো মুহূর্তে তুচ্ছ বিরোধ থেকে প্রাণহানি ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা এখন অনেকের মধ্যেই কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যাকান্ডের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি সমাজে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
কারণ প্রতিটি হত্যাকান্ড কেবল একটি প্রাণের মৃত্যু নয়; এর সঙ্গে ভেঙে যায় একটি পরিবার, অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় বহু মানুষের ভবিষ্যৎ।
আর তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া এই রক্তাক্ত ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।