আগামী ৭ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এতে বক্তব্য দেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
এনসিপির দাবি, জনকল্যাণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই এই ছায়া বাজেটের মূল লক্ষ্য।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব
ছায়া বাজেটে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে। এখানে মোট ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি—
সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি
৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক মানোন্নয়ন তহবিল
৫ হাজার স্কুল জাতীয়করণ
এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য এসএমই ঋণ সম্প্রসারণ, যুব উদ্যোক্তা তহবিল এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
বাজেট আকার ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য
এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি।
দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী—
বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৩.০৯ শতাংশের মধ্যে
মূল্যস্ফীতি ৯.২% থেকে কমিয়ে ৮%
পরবর্তী বছরে ৬% এ নামিয়ে আনা
রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৬.৭% থেকে বাড়িয়ে প্রথম বছরেই ৯.৩২% করার লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়।
রাজস্ব বাড়াতে কর সংস্কার প্রস্তাব
রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য এনসিপি বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক
টিআইএন–এনআইডি–ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংযুক্তিকরণ
সম্পদ কর চালু
অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিল
বন্দর ডিজিটালাইজেশন
এসব উদ্যোগ থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে বলে দলটি দাবি করেছে।
কর কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ৩.৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪.৫ লাখ টাকা, নারী ও প্রবীণদের জন্য ৪.৭৫ লাখ টাকা এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরাধিকার কর চালু ও করপোরেট কর ২৭.৫% থেকে কমিয়ে ২৫% করার প্রস্তাব রয়েছে।
স্বাস্থ্য, কৃষি ও জ্বালানি খাতে বিশেষ উদ্যোগ
স্বাস্থ্য খাতে ২৫% বাজেট বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা, দুরারোগ্য রোগে ৭০% পর্যন্ত ভর্তুকি, এবং নতুন সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি খাতে কৃষকের সরাসরি অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি, আধুনিক শস্য বিক্রয় কেন্দ্র ও খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।
পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ‘সোলার এনার্জি সোভারেনটি অ্যাক্ট’ প্রণয়ন এবং ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী, যুব ও ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রস্তাব
নারী ও যুব উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল, স্যানিটারি ন্যাপকিনে শূন্য ভ্যাট, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মীদের সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় কঠোর আইন, রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন এবং পুঁজিবাজার জিডিপির ৪০% এ উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ ২.০’ রোডম্যাপের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা বলেন, তাদের ৭১ দফা সংস্কার প্রস্তাব কেবল একটি বিকল্প বাজেট নয়, বরং দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগবান্ধব ‘বাংলাদেশ ২.০’ গঠনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ।