আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরাসরি ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা থেকে শেষ মুহূর্তে সরে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে ধনীদের সম্পদের ওপর নতুন কর আরোপের পরিবর্তে বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থাই বহাল থাকছে। এনবিআরের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকার বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ধনী শ্রেণির কাছ থেকে অধিক কর আদায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে সারচার্জের পরিবর্তে সরাসরি সম্পদ কর চালুর একটি প্রস্তাব তৈরি করেছিল এনবিআর। বিভিন্ন দেশের সম্পদ কর ব্যবস্থার আলোকে প্রস্তুত করা ওই খসড়ায় ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের ওপর ধাপে ধাপে ০.৫০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত থাকত। ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদের ওপর ০.৫০ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ, ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকার জন্য ১.৫ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর ২ শতাংশ হারে কর আরোপের পরিকল্পনা ছিল।
বর্তমানে দেশে সম্পদের ওপর সরাসরি কর নেই। বরং আয়ের ওপর প্রদেয় করের ভিত্তিতে সারচার্জ আরোপ করা হয়। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে ৪ কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে এমন নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা ৩০ হাজার ৮০৪ জন। তাদের ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পদের বিপরীতে সরকার বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সারচার্জ আদায় করে থাকে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, সরাসরি সম্পদ কর কার্যকর করা গেলে করদাতার সংখ্যা ২ থেকে ৩ লাখে উন্নীত হতে পারত এবং বছরে অন্তত ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সম্পদ করের পরিধি বাড়ানো গেলে রাজস্ব আদায় ২০ হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারত।
বাজেট সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন ব্যবস্থায় জমি ও স্থাবর সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হতো বর্তমান বাজারদর বা সর্বশেষ সরকারি মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে। পাশাপাশি গাড়ি, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, ব্যাংকের স্থায়ী আমানতসহ অন্যান্য অস্থাবর সম্পদও কর নির্ধারণের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়নি।
অন্যদিকে, করদাতাদের স্বস্তি দিতে এবারের বাজেটে আনা হচ্ছে আয়কর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। ন্যূনতম কর এবং উৎসে করের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী মহলের দাবি ছিল।
বর্তমান আইনে অনেক ক্ষেত্রে উৎসে কেটে নেওয়া করকে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে প্রকৃত করদায় কম হলেও অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে লোকসানি বা কম মুনাফার প্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি করের চাপের মুখে পড়ে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, উৎসে কাটা করকে আর চূড়ান্ত ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হবে না। বরং বছর শেষে প্রকৃত করদায়ের সঙ্গে তা সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। যদি কোনো করদাতার উৎসে কাটা কর তার প্রকৃত করদায়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত অংশ পরবর্তী করবর্ষে সমন্বয় করা যাবে অথবা আবেদন সাপেক্ষে তিন মাসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত পাওয়া যাবে।
এনবিআর জানিয়েছে, ই-টিডিএস (ইলেকট্রনিক ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স) ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো রিফান্ড ও সমন্বয় প্রক্রিয়া ডিজিটালভাবে সম্পন্ন হবে। এতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে রপ্তানিমুখী শিল্প, কাঁচামাল আমদানিকারক, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঠিকাদারি খাত।
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পদ কর চালু না হওয়ায় রাজস্ব আহরণের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হলেও কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার এবং অটোমেটিক রিফান্ড ব্যবস্থা করদাতাদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।