চামড়ার বাজারে ধস, বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

ভোরের ডাক ডেস্ক

বাণিজ্য

ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের কথা বলা হলেও

2026-05-29T11:09:31+00:00
2026-05-29T14:25:33+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
চামড়ার বাজারে ধস, বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা
ভোরের ডাক ডেস্ক
শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬, ১১:০৯ এএম  আপডেট: ২৯.০৫.২০২৬ ২:২৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের কথা বলা হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার অভিযোগ তাদের।

এবারও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে সেই দামে চামড়া কেনার কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি। ট্যানারি মালিকরা গত বছরের তুলনায় কম দাম দিচ্ছেন। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও কম দামে চামড়া কিনছেন।

এবার ঈদে চামড়া সরবরাহ বাড়লেও দামে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। 

সকাল থেকে আশেপাশের এলাকা থেকে এক-দুইটা করে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কিনে গুলশান ২ এলাকায় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করেছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী হালিম। সকালে যে মাপের চামড়া ৯০০ টাকা করে বিক্রি করেছিলেন, বিকাল ৫টায় এসে তার দাম ৭০০ টাকা করে পেয়েছেন বলে দাবি তার।

দরদকষাকষি করে ৭০০ টাকা দরে চামাড় বিক্রি করে অসন্তোষই প্রকাশ করলেন হালিম। তিনি বলেন, দাম নাই। দাম তো কমই। আমার চামড়া এখন নিল ৭০০ টাকা করে। সকালে এই চামড়া ৯০০ টাকা কইরা নিয়া গেছে। গুলশানের আশেপাশের এলাকা থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন তিনি

তবে দাম নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি উড়িয়ে দেন সেখানে চামড়া কেনার দায়িত্বে থাকা ইসলাম ট্রেডার্সের প্রতিনিধি আব্দুর রশিদ। সরাসরি হেমায়েতপুরে হরিণধরার চামড়া শিল্পনগরীতে এ চামড়া পাঠাবেন, এমন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, দাম কম তো বলবেই! কম হলে তো আর কেউ দিত না।

তিনি কত টাকা করে কিনছেন, এমন প্রশ্নে রশিদ বলেন, আমরা প্রতি ফুট চামড়ায় ৩৫-৪০ টাকা করে দিচ্ছি। এরপর লবণ ও শ্রমিক খরচ মিলে প্রতি চামড়ায় ৩০০ টাকা আছে।

দর তো সরকার থেকে নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমরা সেভাবেই দাম দিচ্ছি। দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে তো আর কেউ দিত না। তিনি বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৫০০ এর মতো কোরবানির গরুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করার কথা বলেছেন। হাজার টাকা যায়নি কোনোটা। গড়ে ধরেন ৭৫০ টাকা করে কিনছি।

গুলশান ২ সার্কেলে ঘুরে গুটিকয়েক ফড়িয়া পাওয়া যায়; হেমায়েতপুরে ট্যানারি মালিকদের কাছে কাছে যারা বিক্রি করবেন, তাদেরই প্রতিনিধি তারা। সে কারণে এখানে দাম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

সায়েন্সল্যাব মোড়ে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের স্থান ও সবশেষ এক সময়কার কাঁচা চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় আড়ৎ রাজধানীর লালবাগের পোস্তা ঘুরেও বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমার বিষয়টি জানা যায়।

বেলার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গড়ে সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়েছে।

এবার ঢাকার ভেতরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ঢাকায় প্রতি বর্গফুটে গড়ে ২ টাকা এবং ঢাকার বাইরে সমপরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

এছাড়া সারাদেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হবে ট্যানারিতে, যা গত বছর ছিল ২২ টাকা থেকে ২৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা, যা গতবার ছিল ২০ টাকা থেকে ২২ টাকা।

তবে দাম নিয়ে গতবছরের মতো এবারও হতাশা দেখা যায় বিক্রেতাদের মধ্যে; আড়তদার ও ফড়িয়ারা দায়ী করছেন ট্যানারি শিল্প মালিকদেরকে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম নগরীতেও গরুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা অভিযোগ করেছেন আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ করে চামড়ার দাম কমিয়েছেন। তবে আড়তদাররা তাদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন।

চট্টগ্রামে নগরীতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা গরুর কাঁচা চামড়া বিক্রির তথ্য মিলেছে। গেল বছর চট্টগ্রামে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই সড়কে চামড়া ফেলে যান, তাতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সড়কেই নষ্ট হয়ে যায়। এর আগে ২০১৯ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল।

সরকার নির্ধারিত দাম নিয়ে ক্ষোভ : সরকার কাঁচা চামড়ার যে দাম বেঁধে দিয়েছে, তা নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া উভয়ের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা গেছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা তারা পাচ্ছেন না। আর ফড়িয়ারা বলছেন, তারা বেশি দামে কিনেছেন, কিন্তু পরে ট্যানারি মালিকদের কাছে দাম পাবেন কিনা শঙ্কায় আছেন।

বিকাল সোয়া ৫টার দিকে গুলশান ২ গোলচত্ত্বরে দুটি চামড়া নিয়ে আসেন মহাখালী রেললাইন কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক আবু ইউসুফ। চামড়ার দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা তো ছোটো ব্যবসায়ী। বাজার যাচাই করতে মাত্র দুইটা নিয়ে এসেছি। আরও ছয়টা সংগ্রহে আছে।

কিন্তু দাম তো অনেক কম। দুইটা বলে ১ হাজার ১০০ টাকা। আমরা তো ভাবছি দুইটা হবে দুই হাজার টাকার ওপরে। ২০১৬-১৭ এর দিকে এমন একেকটা চামড়া ৩ হাজার ২০০ টাকা করেও বিক্রি করেছেন বলে দাবি করেন ইউসুফ।

তখন এক ফড়িয়া টিপ্পনি কেটে বলে উঠেন, আমরাও ৫ হাজার টাকা করে কিনেছি। সন্ধ্যা ৬টার দিকে সায়েন্সল্যাব এলাকায় কথা হয় রামপুরার আফতাবনগর থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা মো. শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে, তিনি দুটি মাদ্রাসার প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন।

শিহাব উদ্দিন বলেন, দাম কম মানে, অনেক কম। দাম যেখানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত ছিল। সেখানে দাম দিচ্ছে ৫৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। বিক্রির জন্য ১৩২টি চামড়া এনেছেন তারা। বিক্রি করেছেন গড়ে ৫৮০ টাকা করে।

সরকারি মূল্যে বিক্রি করতে না পারায় সরকারেরও সমালোচনা করে শিহাব উদ্দিন বলেন, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই সরকার দিয়ে আমরা কী করব? তিনি দাবি করেন, এই দামে গরুর চামড়া বিক্রি করে স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিকদের টাকা দিয়ে ‘আর কিছুই থাকবে না’।

সায়েন্সল্যাবে একসঙ্গে আড়াইশর মতো চামড়া কিনছিলেন নজির লেদার এক্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী মো. নজির। তিনি বলেন, আমিসহ এখানে সবাই গড়ে ৫০ টাকা করে বর্গফুট কিনতেছি। লবণ ছাড়াই।

এরপর লবণ দিমু। প্রতি ফুটে খরচ পড়ে যাইব আরও ১০ টাকা। ৬০ টাকা তাইলে পড়েই গেল। কিন্তু পরে দাম আমরা পামু কিনা জানি না।

যাচাই-বাছাইতে অনেক বাদ পড়ে যায় দাবি করে নজির বলেন, লবণ দেওয়ার পর আবার বাছাই করতে হবে। কাটা হলে বাদ। করোনা (চামড়ায় ছোপ ছোপ দাগ ভাইরাসের কারণে) হলে বাদ।

কিন্তু আমরা তো কিনতেছি গড়ে। সবাই টিভি দেখে দাম দিতেছে। আমরাও দিতেছি। কিন্তু সরকারি রেট আমরা পামু কিনা জানি না। তিনি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৭০০টির মতো চামড়া সংগ্রহ করেছেন সায়েন্সল্যাব থেকে।

ঢাকার আরও তিন জায়গা থেকে একই হারে চামড়া সংগ্রহ করার কথা বলেছেন নজির। তিনি বলেন, এসব চামড়ার কিছু তিনি হেমায়েতপুরে বিক্রি করবেন, আর কিছু নিজে রপ্তানি করবেন।

নজিরের সঙ্গে থাকা তার ছেলে বলছিলেন, গড়ে ৫৫০ টাকা ও ৬০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছেন তারা।

লাভের চিন্তা করছি না : রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় কাঁচাবাজার বাজারে আগের মতো সেই চাঙা ভাব না থাকলেও বেশকিছু দিন ধরেই ব্যস্ত যাচ্ছে সেখানকার আড়তদারদের। নানা টানাপড়নের মধ্যে হারানো সেই জৌলুস ফেরাতে চান তারা।

তবে পুরনো সুরেই কথা বলছিলেন তারা। ট্যানারি মালিকদের কাছে পুঁজি হারিয়ে আড়তদাররা প্রকাশ করেছেন নিজেদের বাড়তি মূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের অক্ষমতার কথা।

একই সঙ্গে তারা যে কেবল পুনোনো পৈত্রিক ব্যবসার ‘ঘানি টানছেন, লাভের আশা দেখছেন না’, তাও বললেন।

সন্ধ্যা ৭টায় পোস্তায় গিয়ে দেখা যায় ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া নিয়ে আসছেন ফড়িয়া, মাদ্রাসার প্রতিনিধি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

বাজার কেমন যাচ্ছে, এমন প্রশ্নে শাহাদাত অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক আজীজ বলছেন, দাম কমই। আমরা কত দাম পাব জানি না। লাভের চিন্তা তাই করছি না। এখন কিনতেছি শুধু। পরে কী দাম পাই আল্লাহ জানেন। পরে দেখা যাইব।

তিনি বলেন, এখন কিনে লবণ দিচ্ছি। আমরা তিন দিন ধরে সংগ্রহ করব। ট্যানাররা এক সপ্তাহ পর থেকে আসতে শুরু করবেন। কত করে কিনছেন জানতে চাইলে বলেন, ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা করে। পরে লবণ ও শ্রমিকদের খরচ মিলিয়ে প্রতি চামড়ায় ১৫০ টাকা করে পড়ে।

বৃষ্টির জন্য চামড়ার মান খারাপ হওয়ার শঙ্কা আছে? জবাবে আজীজ বলেন, আজ তো কেবল কোরবানি হল। আগের বৃষ্টিতে কিছু হবে না। লবণ দিলেই সব ‘ওকে’।

তখনও একের পর এক পিকআপ ভ্যানে করে চামড়া আসছিল তার আড়তে। বললেন, লক্ষ্য হচ্ছে ৪০০০-৫০০০ পিস কেনা। দাম নিয়ে একই সুর ফড়িয়াদের সমিতির নেতা মো. শামীমের। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেরও সমালোচনা করেন তিনি।

এর সঙ্গে ট্যানারি মালিকরা ‘টাকা মেরে দেন’ বলেও অভিযোগ তার। এছাড়াও সরকার থেকে লবণে ভর্তুকি দিলে বেশি দামে চামড়া কেনা যেত, বলেন তিনি।

চামড়া সংগ্রহকারীদের এ নেতা বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হল কি জানেন, যে সরকার যে মাদ্রাসারে লবণটা দেয়, সে লবণটা আমাদেরকে দিক। মাদ্রাসাতো লবণ লাগায় না, মাল কিনে না, মাল মাগনা (বিনামূল্যে) পাইয়া মাগনা বেচে।

তো তারে লবণটা কি দেওয়ার দরকার? লবণটা আমরা যদি মাগনা পাই, তাহলে আমরা ২০০ টাকা ১০০ টাকা বাড়ায়া চামড়াটা কিনতে পারবো। আমাদের কষ্ট কমবে, আমরা ওদেরকে দামটা দিতে পারব।

লবণ ও শ্রমিক মিলে প্রতি চামড়ায় ৪০০ টাকা করে খরচ বলে দাবি তার।

শামীম বলেন, ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা লবণের বস্তা। পাঁচটা থেকে ছয়টা মালে (চামড়া) এক বস্তা লবণ দিতে হয়। ২০০ তে ২২০ টাকা লবণ লাগে।

এই একটা চামড়ায় লবণ দিতে ৬০ টাকা, মাল টানতে ১৫ টাকা, আড়তদারি ৫০ টাকা, আপনার মোট ৪০০ টাকা খরচ। মালটা কিনবেন কয় টাকা আপনি? এর মধ্যে বাদ আছে, কাটা আছে। আমরা যত বাইছা লই, তারপরও বাদ আছে।

তিনি বলেন, আমরা ট্যানারির মালিকদের কাছে বেচি। আমাদেরতো মনে করেন টাকা মাইর খেতে খেতে, কোম্পানির মালিকরা টাকা না দিতে দিতে আমাদের পুঁজি হয়া গেছে ছোট।

আমরা ধার-কর্জ নিয়া কোরবানির কামটা করি। অর্থাৎ ২ লাখ, অর্থাৎ ৪ লাখ, অর্থাৎ ৫ লাখ নিয়া এটা করি। যেহেতু চামড়ার সাথে জড়িত একটা সিজন, না করলেও বাইধ্য। ঘুমায়ে থাকলেও ‘উস-পিস’ লাগবে। তাই এই কামটা আমাদের করতেই হইবো।

তিনি বলেন, ঈদের দিন ৪০০-৬০০ চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তিনি। আর ঈদের দ্বিতীয় ২০০-৩০০ এবং তৃতীয় দিন ২০০-৩০০টি চামড়া কেনার কথা বলেন শামীম।

শুধু কোরবানির সময় নয় পোস্তায় সারা বছর রাজধানীতে জবাই হওয়া পশুর চামড়া আসে। কাছের জেলা মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকেও চামড়া আসে দৈনিক।

কাঁচা চামড়ার এসব ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে এ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তাদের আবাসও পোস্তাসহ পুরান ঢাকার আশপাশের এলাকায়।

রপ্তানি বাজার মাথায় রেখে দাম : ফড়িয়াদের নেতা মো. শামীম বলেন, সরকার যে রেটটা দিছে, এই রেটটা আমাদের জনগণ বুঝতেছে আমাগোকে দিছে। কিন্তু সরকার এইটা ফরেন বাজার (রপ্তানি) ঠিক রাখবার জন্য দিছে।

তার ভাষ্য, চামড়া তো এইডি চলেনা। ভালো চামড়া চলে। কাটা চলবে না, দুই চারটা কাটা হলে চলবে। চারটা, পাঁচটা, ১০টা কাটা হইলে তো চলবে না।

এখন সরকারেরটা (দাম) হইলো বিদেশি বাজারের হিসাব। যাতে বিদেশি বাজারে সমস্যা না হয়, এজন্য সরকার বাজারটা (চামড়ার দাম নির্ধারণ) দিছে।

সরকার প্রকাশ্যে দাম কম বললে রপ্তানির বাজারে মুখ থুবড়ে পড়বে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, আমরা যদি কম দাম বলি, বিদেশের বাজারে সমস্যায় পড়ব।

বিদেশি এরা, আমাদের গ্রাহকরা, আমাদের কম দাম লাগাবে। তখন চামড়ার বাজারে আরও ধস নামবে। এইটার জন্য সরকার, এইটারে বিদেশি বাজার ঠিক রাখার জন্য সরকার একটা নির্ধারণ করে দিছে। না হলে আসলে কিন্তু চামড়ার বাজারতো সেরকম না।

আগামী ৩০ জুন শেষ হতে চলা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) চামড়া রপ্তানি খাত থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। 

সবশেষ এপ্রিল মাসে বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়েছিল ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ।

তার আগের দুই বছরে ধস নেমেছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমেছিল ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ। ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ কমেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে।

ট্যানারি মালিকরা ইচ্ছেমত দাম দেয় : হাজী আব্দুর রাজ্জাক অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী শাহাব উদ্দীন অভিযোগ করেন, ট্যানারি মালিকরা ‘ইচ্ছেমত’ দাম দেন। একই সঙ্গে কাঁচা চামড়া কেনার পর বাছাইয়ে অনেক বাদ দেওয়ার কারণে দাম কমে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।

শাহাব উদ্দীন বলেন, মূল কথা হইল গিয়ে, মালের মধ্যে বাদ হয়ে যায় অনেক। এই যে লুকানো বাদ দেওয়ার ব্যাপার যেটা, এটা চামড়া কিনতে গিয়ে বুঝতে পারি না।

যেগুলি বুঝি, চামড়াওয়ালারা যারা নিয়ে আসে, এরা বোঝে না। এইখানে সমস্যাটা হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বাজারে ৫০০ থেকে ৭০০, ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে চামড়া কিনছে। ৫০০ টাকার চামড়া তারা নেন না। ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে নিচ্ছেন।

চামড়ায় ছোপ ছোপ দাগ থাকার সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ট্যানারি শিল্প মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে শাহাব উদ্দীন বলেন, ওরা তো কোনো দাম বলে না। ওরা আমাদেরকে বিগত কয়েক বছর যাবৎ কোনোই দাম বলে না। ওদের ‘ইচ্ছামত’ দাম দেয়। এটা আমরা কোনো কিছু করেও পারিনি।

আমাদের বলে একটা- এত পর্যন্ত। কিন্তু কেনার সময় দেখা যায়- যে আরও ১০ টাকা ২০ টাকা করে কম দাম দেয়। আর তো আপনার খরচ বেশি, কারণ একটা মালের মধ্যে ৪০০, ৪৫০ টাকা খরচ। তারপর বাদ দিলে গড়ে ৬০০ টাকার মত খরচ হয়ে যায়। কারণ ২০-৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে দেয়।

এরপর আর ‘লবণের টাকা ওঠে আসে না’ দাবি করে তিনি বলেন, এক্কেবারে লবণের টাকা উঠে না। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতানও বললেন একই কথা।

নতুন মৌসুমি ব্যবসায়ী আসায় কাঁচা চামড়ার মান ও দাম দুই-ই সংকটে পড়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে এ ব্যবসা ‘পুরনোদের’ কাছে রাখার দাবি জানান তিনি।

সেক্ষেত্রে সহজে লবণপ্রাপ্তি, পুঁজির জন্য ঋণ সহায়তা এবং ট্যানারি মালিকদের কাছে যে পাওনা আছে তা পেতে সরকারকে এগিয়ে আসার কথা বলেন টিপুর সুলতান।

তার ভাষ্য, শুধুমাত্র পুরনো ব্যবসায়ীদের কাছে এ ব্যবসাটা না থাকলে এ খাত ধ্বংস হবে।

কারো থেকে অর্থ সহায়তা না পেয়ে নিজেদের পুঁজিতে এ ব্যবসা করতে হচ্ছে এবং সেক্ষেত্রে ধার-কর্জ করে এ ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

তিনি বলেন, সেই পুঁজিও ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে আছে। এজন্য লবণ কিনে যে চামড়া সংরক্ষণ করব, বেশি দামে বেচব, রপ্তানি করব এটিও ‘চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে’।

পোস্তায় ঘুরে আড়তদাররা বেশিরভাগ চামড়া সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মূল্যে গড়ে কিনতে দেখা যায়। সর্বোচ্চ দাম ৮০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন দাম ৪০০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে।

বিটিএ নেতা যা বললেন : সাধারণত বড় আকারের গরুর চামড়া ৩১ থেকে ৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২১ থেকে ৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া ১৬ থেকে ২০ বর্গফুটের হয়।

সে হিসাবে লবণযুক্ত ছোট আকারের একটি চামড়ার দাম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আর মাঝারি আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় আকারের লবণযুক্ত গরুর চামড়া ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এবার চামড়ার দাম কম কেন, এ প্রশ্নে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অবস্থা—এ সবকিছুই কিন্তু যে কোনো বাজার দরের উপর নির্ভর করে। যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বই এখন টালমাটাল; থামবে থামবে বলেও থামছে না। এ অবস্থায় আমাদের রপ্তানি বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।

তার দাবি, দেশে মূল্যস্ফীতি বেশি; ৯ শতাংশের ওপরে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।

এবার কিন্তু দেখবেন, প্রচুর গরু বিক্রি না হয়ে ফেরত গেছে; ব্যবসায়ীরা হা-হুতাশ করছেন। তাদের নাকি অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমার মনে হয়, এবার মানুষ আগের চেয়ে কম পশু কোরবানি দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ। নতুন সরকার আসলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

বিনিয়োগের খারাপ অবস্থা তুলে ধরে শাহীন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে কখনও এত কম প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

এ সবের প্রভাব চামড়ার দামের ক্ষেত্রেও পড়েছে বলে আমার মনে হয়।

আরেকটি কারণ আছে—সেটি হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে আওয়ামী লীগের লোকজনও (নেতা) কিন্তু এবারও কোরবানি দিতে পারেনি। এটাও কোরবানি কম হওয়ার কারণ বলে আমার মনে হয়, বলেন শাহীন আহমেদ।

সতর্ক রয়েছে সরকার : কোরবানির ঈদের দিন বৃহস্পতিবার ঢাকার আমিন বাজারের চামড়া বিক্রয় কেন্দ্র আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেছে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

মন্ত্রণালয়ে সংবাদিক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা, ‘সিন্ডিকেট’ বা চামড়ার অপচয় না ঘটে সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে মন্ত্রী বলেছেন।

মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথাও বলেছেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী কাঁচা চামড়ার ক্রেতা ও বিক্রেতা, আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বাজার পরিস্থিতি, মূল্য, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: