গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসার খন্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশের ফ্ল্যাটের সাবলেট ভাড়াটিয়া ৩২ বছর বয়সী সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এই ঘটনার পর পরই ফুঁসে উঠে পুরো দেশ।
রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশেই চলছে প্রতিবাদ বিক্ষোভ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে ছুটে যান হত্যাকান্ডের শিকার কন্যা শিশুটির বাসায়। পিতা মাতাকে সান্তনা দিয়ে আশ্বাস দেন দ্রুত বিচারের।
এছাড়া চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও উত্তেজিত জনতার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে সংঘর্ষ। রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা তুলাতুলি এলাকা।
অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে দুই গাড়িতে থাকা ১৪ পুলিশকে অবরুদ্ধ করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এছাড়া বাকলিয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আগ্রাবাদ ও বায়েজিদে আরও তিন শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার আগ্রাবাদের ঘটনায় স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে পিটুনি দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিত জনতা প্রায় দুই ঘণ্টা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫০টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণ। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়; এর মধ্যে ১২৬টিতে মামলা হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি, ১১৮টি, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৪৬টি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশুদের ওপর নৃশংস যৌন সহিংসতার ঘটনায় পুরো দেশ যেন স্তম্ভিত হয়ে গেছে। কন্যা শিশুদের ওপর এমন বর্বরতা কোনো ভাবে মেনে নিতে পারছেন না সমাজের সর্বস্থরের মানুষ। ফলে প্রতিবাদে বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে জনতা। কেউ কেউ শিশু ধর্ষন ও হত্যাকারীদের প্রকাশ্যে ফাসি দেওয়ারে দাবি তুরেলছে।
দেশের রাজনৈতিক দল, নারীবাদী সংগঠন, শিশু অধিকার সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সমাজের সর্ব স্থরের প্রতিনিধিরা মনে করেন, যে কোনো মূল্যে অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিরোধ, অভিযোগ দায়ের, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা, সমাজসেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে।
এ ছাড়া নারী ও শিশুদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা ও পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে আরও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন সমাজের বিশিষ্টজনেরা।
শিশু নির্যাতন ও ধর্ষকদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন স্বয়ং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, আইন সংশোধন করে এই ধরনের পাষণ্ডদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সাত দিনের মধ্যে প্রকাশ্যে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার সাহস আর কেউ না পায়। গতকাল বেলা ১১টার দিকে চমেক হাসপাতালে ধর্ষণচেষ্টার শিকার তিন শিশুকে দেখতে গিয়ে এ প্রতিক্রিয়া জানান চসিক মেয়র।
এ সময় মেয়র বলেন, তিন-চার বছরের মাসুম বাচ্চাদের ফুসলিয়ে, চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কেউ না কেউ নিয়ে যাচ্ছে। এটি একদিকে আমাদের সমাজের তীব্র নৈতিক অবক্ষয়, অন্যদিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ২০-৩০ টাকা দিয়ে ছোট শিশুদের একা একা দোকানে পাঠানো উচিত নয়, কারণ এই সুযোগেই ওঁত পেতে থাকা অপরাধীরা এ ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে।
দেশে নারী ও শিশুর প্রতি বাড়তে থাকা সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এসব ঘটনাকে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরা হয়।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ দেশের ৬৪ জেলার নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এছাড়া বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক নৃশংস সহিংসতার ঘটনায় আর্ন্তজাতিক সংস্থা ইউনিসেফও গভীরভাবে মর্মাহত ।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নৃশংস ও যৌন সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায়, দেশব্যাপী শিশু ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের জরুরি প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।