পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশজুড়ে জমে উঠেছে কুরবানির পশুর হাট। পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই ও মাংস সংরক্ষণ—প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ।
তিনি বলেন, কুরবানির পর সাধারণত দুই থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে যে মাংস রান্না করা হয়, তা প্রকৃত অর্থে ‘মাংস’ নয়; বরং সেটি কেবল পেশি বা মাসল। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও সময় অনুসরণ না করলে কারকাস পূর্ণাঙ্গ মাংসে রূপ নেয় না। ফলে শরীর কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিগুণ পায় না।
অধ্যাপক আজাদ জানান, জীবিত পশুর দেহে মাসলের তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। জবাইয়ের পর এই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামতে হয়। এজন্য কারকাসকে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২৪ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা প্রয়োজন। এতে প্রোটিন ভেঙে অ্যামিনো অ্যাসিডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং মাংস পরিপক্বতা পায়।
তিনি বলেন, তাপমাত্রা দ্রুত কমে গেলে মাংসের মাইক্রোস্ট্রাকচার সংকুচিত হয়ে ভেতরের পানি বাইরে চলে আসে। এ অবস্থায় দ্রুত রান্না করলে মাংস শক্ত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক রসালোভাব হারায়। তাই মাংসকে নরম ও সুস্বাদু করতে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আরও দুই থেকে তিন দিন সংরক্ষণ করা ভালো। এতে বের হয়ে যাওয়া পানি আবার ফাইবারে ফিরে আসে এবং মাংসের আর্দ্রতা বজায় থাকে।
গরুর মাংসের আসল ফ্লেভার তৈরি হতেও অন্তত তিন দিন সময় লাগে বলে জানান তিনি। এর আগে রান্না করলে কাঁচা গন্ধ বা ইউরিক অ্যাসিডজাতীয় গন্ধ থেকে যেতে পারে।
ভালো গরু চেনার উপায়
ড. আজাদ বলেন, ভালো মানের মাংসের জন্য গরুর শরীরে মাংসের বণ্টন সমান ও সুষম হওয়া জরুরি। শরীরজুড়ে অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত গরুর মাংস তুলনামূলক কম সুস্বাদু হয়। এছাড়া গলার নিচের ঝুলন্ত অংশ স্বাভাবিক থাকলে সেটি ভালো স্বাস্থ্যের লক্ষণ।
তিনি জানান, রেড চিটাগাং, শাহীওয়াল ক্রস, পাবনা ক্যাটেল বা নর্দার্ন গ্রে জাতের সঙ্গে বিদেশি জাতের ক্রস ব্রিডিং করা গরুর ওজন সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজির বেশি হয়। তবে অতিরিক্ত ওজনের গরুর মাংসে চর্বির পরিমাণও বেশি থাকে। এতে মাংস জুসি হলেও স্বাভাবিক অ্যারোমা ও টেক্সচার কমে যায়।
গুণগত মান বিবেচনায় ২০০ থেকে ২৫০ কেজি ওজনের দুই দাঁতের দেশি গরুকে সবচেয়ে উপযোগী বলে মত দেন তিনি।
ফ্রিজিংয়ের ভুলেই নষ্ট হয় মাংসের গুণগত মান
ড. আজাদ বলেন, কুরবানির পরপরই মাংস সরাসরি মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ডিপ ফ্রিজে রাখা ঠিক নয়। এতে মাংসের স্বাভাবিক বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে না। পরে ডিফ্রস্ট করার সময় মাংসের মাইক্রোস্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত পানি বের হয়ে গিয়ে টেক্সচার নষ্ট হয়।
তিনি জানান, সঠিক পদ্ধতি হলো—প্রথমে ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্রম কমাতে অল্প সময়ের জন্য ডিপ ফ্রিজে রাখা যেতে পারে। এরপর ১ থেকে ২ কেজি করে প্যাকেট বানিয়ে সাধারণ ফ্রিজের ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস অংশে অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সংরক্ষণ করতে হবে। এতে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা কমে এবং মাংসের স্বাভাবিক গুণগত মান বজায় থাকে।
এরপর ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে মাংস ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব বলে জানান তিনি।