১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। দিবসটির প্রাক্কালে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-কে ঘিরে উঠেছে ইতিহাস উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে আগের তুলনায় দৃশ্যমান উপস্থাপনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়।
রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর শুধু একটি প্রদর্শনশালা নয়, বরং রাষ্ট্রের ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। ১৯১৩ সালে ‘ঢাকা জাদুঘর’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর। জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, ৯৩ হাজার ২৪৬টি নিবন্ধিত নিদর্শনের বিপরীতে চারতলা ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ১৭৮টি নিদর্শন। বাকি সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে স্টোরে।
রবিবার (১৭ মে) জাদুঘর পরিদর্শনে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আগের মতো আলাদা উপস্থাপনা আর নেই। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা দর্শনার্থী রায়হান কবীর বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেখতে এসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন কিংবা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তার নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনা খুঁজে পাননি। তার ভাষায়, “স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনি এত বড় মহানায়ক, কিন্তু সেই গুরুত্ব গ্যালারিতে প্রতিফলিত হয়নি।”
মিরপুরের শাহনাজ পারভিন মিলা এবং নওগাঁর খাজামাত উদ্দিনও একই ধরনের পর্যবেক্ষণের কথা জানান। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে আগের দৃশ্যমানতা কমেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, কোনো নিদর্শন নষ্ট করা হয়নি। জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় হামলা বা ভাঙচুরের আশঙ্কায় কিছু প্রতিকৃতি ও নিদর্শন সাময়িকভাবে সরিয়ে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তার ভাষায়, “জাদুঘরের দায়িত্ব নিদর্শন সংরক্ষণ করা, ধ্বংস করা নয়।”
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে নয়, ধারাবাহিক ও গবেষণাভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। তিনি জানান, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই অভ্যুত্থানসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস নতুনভাবে উপস্থাপনের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। তার মতে, “১৯৭১, ১৯৫২ ও ২০২৪—সব ইতিহাসই প্রাধান্য পাবে।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে ভিডিওভিত্তিক উপস্থাপনা, অডিও গাইড ও ডিজিটাল অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিহাসকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হবে। শিশু ও প্রযুক্তিবান্ধব জাদুঘর গড়ে তুলতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান ভবনের পাশাপাশি ১০ তলাবিশিষ্ট নতুন অ্যানেক্স ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সেখানে নতুন গ্যালারি, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশেষায়িত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে পৃথক ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের প্রস্তুতিও চলছে। আগামী ৫ আগস্টের মধ্যেই এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে আজ জাতীয় জাদুঘরে বর্ণাঢ্য র্যালি, বিশেষ প্রদর্শনী, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।