জালিয়াতির অভিযোগসহ নানা বিতর্কে জর্জরিত ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫’ এর চূড়ান্ত নিয়োগপ্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে তড়িঘড়ি করে নির্বাচিত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ১ মাসের মধ্যেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়, কিন্তু এরপর ৩ মাস পার হলেও হয়নি চূড়ান্ত নিয়োগ। রাজধানীতে সড়ক অবরোধসহ নানা আন্দোলনের পর তাদের নিয়োগ নিয়ে সুখবর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
সর্বশেষ পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রার্থীদের শিক্ষাগত সনদ (পূর্বে জমা দেওয়া) ও অন্যান্য কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই প্রক্রিয়া চলছে। একই সাথে প্রার্থীদের পূর্ব কার্যকলাপ যাচাইয়েরও নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
“ঠিক কবে নাগাদ এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে” এমন প্রশ্নের উত্তরে গতকাল বুধবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন বিভাগের সহকারী পরিচালক (নিয়োগ) আইরিন পারভীন ভোরের ডাককে বলেন, এটা আমরা জানিনা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানে। বর্তমানে প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে। “ভেরিফিকেশন কবের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে” এর জবাবে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট করে সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। প্রার্থী কোনো ভুল তথ্য দিয়েছে কিনা, কোনো মামলার আসামী কিনা, মাদকাসক্ত কিনা এসব তথ্য পুলিশ যাচাই করে আমাদের কাছে যেদিন জমা দিবে, এরপর আমরা পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করব।
যোগদানের পূর্বে আর কি কি প্রক্রিয়া বাকি আছে- এর উত্তরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা জানান, পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর এএসআই গোয়েন্দা রিপোর্ট সম্পন্ন হলে তাদের ট্রেনিং শুরু হবে। এসবের পরে তাদের চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে পাঠানো হবে।
এদিকে চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ৯ জানুয়ারি তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১টি জেলায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশের ১ হাজার ৪০৮টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আবেদন করেন ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি প্রার্থী, পরীক্ষায় অংশ নেন ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৮ জন। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় ২১ জানুয়ারি। এতে উত্তীর্ণ হন ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থী। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয় ২৮ জানুয়ারি যা চলে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন শেষে এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে নির্বাচিত হন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী।
৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে পরীক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আন্দোলনে নামে এবং পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি তুলে। এরপর মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও স্বজনপ্রীতি, ‘টাকায় ভাইবা পাশ’, পুকুড়চুরির অভিযোগ এনে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানায় পরীক্ষার্থীরা।
নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় প্রশ্নফাঁস ও ‘ডিভাইস পার্টি’র সক্রিয়তা নিয়ে। পরীক্ষার কয়েকদিন আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে এবং পরীক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, কিছু প্রশ্ন হুবহু মিলে যায়।
এছাড়া উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিশেষ করে গাইবান্ধা, নওগাঁ, দিনাজপুর ও কুড়িগ্রামে ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতির অভিযোগে শতাধিক পরীক্ষার্থীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। এই অনিয়মের প্রতিবাদে চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি বড় অংশ মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন এবং পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেন। একইসাথে প্রশ্ন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন পরীক্ষার্থীরা।
কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কারো কথা তোয়াক্কা গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ প্রক্রিয়া অনেকটা চূড়ান্ত করে ফেলে। এরপর নতুন সরকার গঠনের পর এই নিয়োগ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সচিবরাও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানান। পরে দ্রুত নিয়োগপত্রের দাবিতে সুপারিশপ্রাপ্তরা নামে আন্দোলনে। সড়ক অবরোধ, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা আন্দোলনের পর গত ৩ মে কাটে সকল অনিশ্চয়তা।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে কাউকেই বাদ দেওয়া হবে না। তবে তার আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এহছানুল হক মিলন বলেছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি যে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে, তাতে যদি অনিয়ম হয়, কোনো ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে তা তদন্ত করা হবে। তদন্তে তেমন কিছু প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি উঠলেও, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না আসায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছিলেন যে, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো এড়িয়ে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে ভেরিফিকেশনসহ সব কাজ শেষ করে খুব দ্রুত চূড়ান্ত নিয়েগ চান সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা। আর যাতে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়, তা নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচিত প্রার্থীরা। তারা জানান, নিয়োগের আশায় তারা আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং এখন তারা পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাই তাদের একটাই দাবি, হাতে চাই নিয়োগপত্র।