গ্রীষ্মের তালপাকা দুপুর। সূর্য যেন মাথার ওপরে জ্বলন্ত আগুন হয়ে চারপাশ ঝলসে দিচ্ছে। কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, বাতাসও যেন আগুনের উত্তাপ নিয়ে ধেয়ে আসছে। এমন দহনজ্বালা দুপুরেই ঠিক করলাম, বেরিয়ে পড়ব বগুড়ার প্রাচীন জনপদ কাহালুর পথে—রহস্যময় এক পুরোনো মসজিদের খোঁজে। আমার সঙ্গী মেহেদী। লোকমুখে প্রচলিত, এই মসজিদকে ঘিরে আছে ভয়ংকর সব অলৌকিক কাহিনি।
স্টেশন রোড থেকে সিএনজিতে চেপে পৌঁছালাম কাহালু স্টেশনে। গ্রামীণ পরিবেশের ছোট্ট এক হোটেলের টুলে বসে সকালের নাস্তা শেষ করলাম। এরপর কিছুটা পথ হেঁটে নসিমনে উঠে রওনা দিলাম বোরতা গ্রামের দিকে। সরু মেঠোপথ ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল। বাতাস বইছিল ঠিকই, তবে সেই বাতাসও যেন আগুনের শিখার মতো মুখে এসে লাগছিল।
রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, কোথাও কোথাও গরু-মহিষের গাড়ি—সব মিলিয়ে এক শান্ত গ্রামীণ দৃশ্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেও মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল এক প্রশ্ন—লোকমুখে শোনা ভৌতিক মসজিদের গল্প কি সত্যিই সত্য?
বোরতা গ্রামে পৌঁছে পাকা সড়কের ধারে যাকে পাচ্ছি, তাকেই জিজ্ঞেস করছি বটগাছে ঘেরা সেই মসজিদের কথা। কিন্তু কেউ খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। অবশেষে এক বৃদ্ধ আমাদের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলেন। তারপর দূরের বিশাল এক বটগাছের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “ওই গাছের নিচেই লুকিয়ে আছে মসজিদ। দিনে দেখতে পারো, কিন্তু রাতে কাছে যেও না। আজান ছাড়া আরও অনেক অদ্ভুত শব্দ শোনা যায় সেখানে!”
পাকা রাস্তা ছেড়ে নেমে পড়লাম চাষের জমিতে। হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে আছে। পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের নরম মাটিও স্পষ্ট দেখা যায়। তবে পা ফেললেই কাদা মিশে ঘোলা হয়ে যাবে। প্রথমে নামতে ইচ্ছে করছিল না, কিন্তু উপায় ছিল না। জুতা হাতে নিয়ে পানির ভেতর দিয়েই এগোতে শুরু করলাম। এরপর সরু আল ধরে হাঁটতে থাকলাম রহস্যময় সেই বটগাছের দিকে।
মসজিদের যত কাছে যাচ্ছিলাম, গরম যেন ততই অসহনীয় হয়ে উঠছিল। কিন্তু বটগাছের ছায়ার ভেতর ঢুকতেই হঠাৎ শরীর কাঁপিয়ে বয়ে গেল শীতল বাতাস। মুহূর্তেই যেন মিলিয়ে গেল চিটচিটে গরম।
বিশাল বটগাছের শেকড় নেমে এসেছে মাটিতে। সেই শেকড় যেন দেয়ালের মতো ঘিরে রেখেছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন এক মসজিদকে। মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া শেকড়ের ফাঁকে চোখে পড়ল রঙিন সুতা, আগরবাতি আর কিছু দেশি মুদ্রা। গ্রামের মানুষ নাকি সুযোগ পেলেই এখানে এসে মনের কথা বলে যান।
বটগাছে আচ্ছাদিত মসজিদের পূর্বপাশে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। উত্তর পাশের জানালাগুলো শেকড়ে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল দেয়ালে ম্লান হয়ে যাওয়া রঙিন আল্পনা। তবুও মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত প্রতিদিন সেগুলো নতুন করে সাজিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই ভেসে এলো মৃদু এক সুর। মনে হলো, কেউ যেন আজান দিচ্ছে। কিন্তু আশপাশে তো কোনো মানুষ নেই! আমি মেহেদীর দিকে তাকালাম। সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি কি শুনতে পাচ্ছো?”আমি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্যাওলা ধরা গম্বুজগুলো প্রহরীর মতো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। মিম্বরের অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও মনে হচ্ছিল, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। খসে পড়া ইটের দেয়ালের পাশে যেন ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন মুসল্লি।
মনের ভেতর তখন ভয়ের রাজত্ব। তবুও সাহস সঞ্চয় করে চারপাশ ঘুরে দেখলাম। পশ্চিম পাশে যাওয়ার সাহস হলো না। একদিকে দিঘি, অন্যদিকে সাঁতার না জানা—সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক ভয় গ্রাস করছিল।
মসজিদের পাশেই রয়েছে লম্বা একটি কবর। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ফুট। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, এটি কোনো অলৌকিক সাধকের কবর। লোকমুখে প্রচলিত আছে, তিনি নাকি এখনো এখানেই আছেন। গভীর রাতে কবর থেকে আলো বের হয়। কখনো মসজিদের পাশে আগুন জ্বলে ওঠে। পাশের দিঘিতে মাঝেমধ্যে ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা মাছ, আর আলখেল্লা পরা এক রহস্যময় অবয়ব।
ভরদুপুরে এসব কথা শুনে শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো।
কবরের কাছে যেতেই আবার বইল শীতল বাতাস। প্রচণ্ড গরমের মাঝেও শরীর কেঁপে উঠল। মনে হলো, কেউ যেন আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু আশেপাশে কাউকে দেখা গেল না। মেহেদী আতঙ্কিত গলায় বলল,
“চলো, এখানে আর দাঁড়ানো ঠিক হবে না।”
ঠিক তখনই এক কৃষক এগিয়ে এসে বললেন, “রাতে এখানে এলে বটগাছের শেকড় নড়ে ওঠে। মসজিদের ভেতর থেকে নামাজের শব্দ আসে। কখনো আবার কান্নার আওয়াজও শোনা যায়।”
রোদে পোড়া খালি গায়ের সেই কৃষকের কথা শুনে গলা শুকিয়ে গেল। দূরে তাকিয়ে দেখলাম, বটগাছের শেকড়গুলো সত্যিই যেন দুলছে। গরম বাতাসে, নাকি অন্য কিছুতে—বুঝতে পারলাম না।
সূর্য তখনও মাথার ওপরে জ্বলছে। তালপাকা গরম শরীর পুড়িয়ে দিচ্ছিল। দ্রুত গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাদের অনুসরণ করছে। নসিমনে উঠে শেষবারের মতো তাকালাম বটগাছের দিকে। গম্বুজের আড়ালে যেন কোনো ছায়ামূর্তি নড়েচড়ে উঠল।
মেহেদী কাঁপা কণ্ঠে বলল, “আজ আমরা শুধু একটা পুরোনো স্থাপনা দেখিনি, আরও কিছু অনুভব করেছি।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু অনুভব করছিলাম, গরমের মাঝেও ঠান্ডা ঘাম গড়িয়ে পড়ছে শরীর বেয়ে। মনে হচ্ছিল, বটগাছে আচ্ছাদিত সেই মসজিদ যেন এখনো আমাদের পিছু নিচ্ছে।
ফিরে আসার পরও যখনই চোখ বন্ধ করেছি, মনে হয়েছে আমি আবার সেই মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। দেয়ালের আল্পনা, শেকড়ে আটকে যাওয়া জানালা আর মিম্বারে দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য কোনো প্রার্থনাকারী—সবকিছু যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
গ্রীষ্মের সেই তালপাকা দুপুরে আমাদের ভ্রমণ শেষ হলেও রহস্যের যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। হয়তো মসজিদটি শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, বরং অদৃশ্য কোনো জগতের দরজা—যা খুলে যায় কেবল সাহসীদের জন্য।