বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১/১১-এর সময় অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যম মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান। বিএনপির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বিলেতে ১৭ বছর কেমন ছিলেন? কীভাবে ছিলেন? কেনইবা তাকে বিলেতে যেতে হলো- তা নিয়ে অন্তহীন কৌতূহল। কখন, কীভাবে ও কারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল তা দীর্ঘ সময় ধরে অজানাই ছিল।
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ১/১১-এর সময় ২০০৭ সনের ৭ই মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে। কারা গ্রেপ্তার করেছিলেন, কীভাবে করেছিলেন তার একটি বয়ান রয়েছে প্রাপ্ত অনুসন্ধানে।
এতে জানা যায়, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনের উপস্থিতিতে আর্মি হেড কোয়ার্টারে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মেজর ইমরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন রানার ও একজন ড্রাইভার নিয়ে তিনি মইনুল হোসেন রোডস্থ খালেদা জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন। এ সময় বাসভবনের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি ছিল। মেজর ইমরান বাসভবনের মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে নিজ গাড়িতেই অবস্থান নেন। আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর তারেক রহমান বাসভবন থেকে বের হলে মেজর ইমরান তাকে নিয়ে গাড়িতে উঠেন। নিয়ে যান নির্ধারিত গন্তব্যে। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মেজর ইমরানের সঙ্গে থাকা রানার তারেক রহমানের মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এ সময় তারেক রহমান জানালা খোলার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মেজর ইমরান তা নাকচ করে দেন।
এরপর সিটিআইবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। সিটিআইবির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার নির্দেশেই অন্য কর্মকর্তারা বিশ্রী ভাষায় তারেক রহমানকে গালিগালাজ করেন। জেআইসিতেই তারেক রহমানকে তিন-চারদিন রাখা হয়। সেখানে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা হয়। হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হয়। দীর্ঘসময় একটানা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। যা ছিল অমানবিক, বর্বরোচিত।
তারেক রহমানকে দুইবার জেআইসিতে আনা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে টানা কয়েকদিন জেআইসিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রব খান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে তারেক রহমানের কাছ থেকে একটি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যে জবানবন্দিতে তারেক রহমান তার ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান বলে দাবি করা হয়।
এই সময় কারা কারা উপস্থিত ছিলেন সেই তথ্যও বেরিয়ে এসেছে সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে। চারজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে এই জবানবন্দি আদায় করেন। এর মধ্যে ছিলেন- লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাহিদ হোসেন ও মেজর (অব.) মনির। নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানকে অনেকটা পঙ্গু করে ফেলা হয়।
স্বাভাবিকভাবেও তিনি হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তার ওপর নির্যাতনের একটি কাহিনী অনুসন্ধানী রিপোর্টে সন্নিবেশিত রয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ সম্পর্কে একটি জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নানি মারা যান। এ সময় তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। সে সময় জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেন, তারেক রহমান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। তখন তিনি জানার চেষ্টা করেন- কীভাবে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।
পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে পারেন ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তারা তার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এতে তিনি বিচলিত হয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের কাছে জানতে চান- কেন এই নির্যাতন চালানো হয়েছে? এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
জেনারেল মাসুদ তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার অনেক দূরত্ব তৈরি হয়। নির্যাতনের সময় তারেক রহমানকে কীভাবে রাখা হয়েছিল তার একটা বর্ণনা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের নির্দেশে এই নির্যাতন চালানো হয়। তার নির্দেশে তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ওয়ারেন্ট কর্মকর্তা ফজলু জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ব্রিগেডিয়ার আমিন তাদেরকে বলেছেন- পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে। এক পর্যায়ে সিলিং থেকে তিনি পড়ে যান এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পান। বছরের পর বছর তারেক রহমানকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। এসব ঘটনায় সাত পদস্থ সেনা কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে অনুসন্ধানে।
এই কর্মকর্তারা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন (তৎকালীন সিটিআইবির পরিচালক), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী (তৎকালীন সিটিআইবি’র পরিচালক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের চৌধুরী (তৎকালীন জেএসও-এক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান (তৎকালীন জেআইসি অধিনায়ক সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. ফরিদ উদ্দিন (তৎকালীন জেএসও-১) এবং মেজর (অব.) মনির (তৎকালীন জেএসও-২, সিটিআইবি)।