
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা কৃষি ও মৎস্যসম্পদের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত চরের মানুষ। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত এর একটি উদাহরণ। চরটিতে দুই হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও সেখানে নেই স্বাস্থ্যসেবার কোনো ব্যবস্থা।
চরের বাসিন্দারা জানান, কোনো প্রসূতির প্রসববেদনা উঠলে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে তাকে প্রমত্তা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে নিয়ে যেতে হয় সদর হাসপাতালে।
পরিবারের সদস্যদের মুখোমুখি হতে হয় চরম দুর্ভোগের। শুধু প্রসূতিই নয়, সাধারণ রোগ-ব্যাধিতেও কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই চরে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় নারী, শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হলে।
সম্প্রতি সরেজমিনে চর জানাজাতে গিয়ে দেখা যায়, নদীপথে খেয়া পারাপারই এখানকার মানুষের একমাত্র যোগাযোগব্যবস্থা। চরের অধিকাংশ বাসিন্দা জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবা দুষ্প্রাপ্যতা তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য এই চরে কোনো সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। ফলে সামান্য অসুখ-বিসুখেও এখানকার মানুষকে ঝাড়ফুঁক কিংবা হাঁতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভর করতে হয়।গুরুতর অসুস্থতায় রোগীকে নিয়ে যেতে হয় শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পদ্মায় চরজানাজাত চরটি জেগে ওঠে ২০২১ সালে। ২০২২ সাল থেকে সেখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়। চর থেকে নদীপথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। প্রতিকূল আবহাওয়া, নদীর তীব্র স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতের বেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। জরুরি রোগী পরিবহনে নেই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় গর্ভবতী নারীদের। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। ফলে মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ ছাড়া শিশুদের অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপে চরে নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা।
চরের বাসিন্দা জুলেখা বেগম ভোরের ডাক কে বলেন, ‘চরের জীবন খুবই কষ্টের। এখানে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক- কিছুই নেই।’ তিনি বলেন, ‘গত মাসে আমার প্রসববেদনা উঠলে রাতে কোনো নৌকা পাওয়া যায়নি। অনেক কষ্টে ভোরে নদী পার হয়ে পাঁচ্চর হাসপাতালে যেতে হয়। মাঝরাতে যদি কিছু হয়ে যেত, তাহলে হয়তো বাঁচতাম না। আমরা চাই সরকার চরে দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করুক।
জব্বার মোল্লা নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। নদী পার হতে সময় লাগে, অনেক সময় অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। সরকার যদি চরে একটি হাসপাতাল করতো, তাহলে আমাদের কষ্ট অনেকটা কমতো।
আক্ষেপ নিয়ে জব্বার মোল্লা বলেন, ‘কতজন কত প্রতিশ্রুতি দিল, হাসপাতাল হবে, রাস্তা হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই সেই প্রতিশ্রুতি রাখে নাই। আমরা শুধু শুনেই গেছি, বাস্তবে কিছুই পাই নাই। আমাদের কষ্ট যেন কারো চোখেই পড়ে না।’
চরের বাসিন্দা তাসলিমা সালমা বিবি দুই সন্তানের মা। তিনি বলেন, ‘চরের জীবন পুরোটাই কষ্টের। বাজার, চিকিৎসা ও পড়ালেখা করতে খুবই কষ্ট হয়। আমার ছেলের জ্বর ও ডায়রিয়া হলে খুব ভয় লাগে। এখানে কোনো ডাক্তার নেই, ওষুধও সহজে পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের কাছে যেতে হয়। চরে যদি ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে এত কষ্ট হতো না।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, ‘চরে কোনো ক্লিনিক নেই, নেই চিকিৎসক। চরের মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। আমরা চাই এখানে চিকিৎসকসহ আধুনিক সুবিধাসংবলিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। যেখানে সেবা পাবে চরের প্রসূতিসহ সব বয়সের মানুষ।
চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারী বলেন, ‘চরে আমরা সরকারি কোনো স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছি না। একটি ক্লিনিকও স্থাপন করা হয় নাই। গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না। আমরা যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রহর গুণছি। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান বলেন, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জনবল সংকটের কারণে দুর্গম চরে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে উপ-সহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। নতুন চরে মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মতিউর রহমান আরো বলেন, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে ৩০ শতাংশ জমি প্রয়োজন, যা ইউএনও কমিটির মাধ্যমে পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এমটিআই