জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে শস্যভাণ্ডার খ্যাত সিরাজগঞ্জের চলনবিল অঞ্চলে কৃষকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় অনেক স্থানে বিকল হয়ে পড়েছে সেচ পাম্প। ফলে চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে এই এলাকার কৃষকদের।
কৃষকেরা বলছেন, সময়মতো জমিতে সেচ দিতে না পারলে ধান উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় অনেক সময় বাড়তি দামে বাইরে থেকে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চলনবিল এলাকার কৃষকেরা।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তাড়াশ উপজেলার ৮ ইউনিয়নে ২২ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এই বিশাল আয়োতনের কৃষি অঞ্চলে ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৭ হাজার ১৫টি। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এসব পাম্প সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মাধাইনগর ইউনিয়নের কৃষক কে এম জহির রায়হান বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বোরো ধান উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তিনি চলতি মৌসুমে ৬০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। নিজের ২টি ডিজেলচালিত সেচ পাম্প ও ১টি সেচ মটর দিয়ে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।
তিনি জানান, আবহাওয়া ভালো থাকলে সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন জমিতে পানি দিতে হয়। এতে একদিন সেচ দিতে লাগে প্রায় ২৫ লিটার ডিজেল। কিন্তু বর্তমানে ডিজেল সংকটের কারণে জমিতে পানি দেওয়া নিয়ে ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
জহির রায়হান আরও বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ মটর দিয়েও ঠিকভাবে পানি তোলা যাচ্ছে না। পেট্রোল পাম্পে সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় মাত্র ১০ লিটার তেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার প্রয়োজনীয় ডিজেলও মিলছে না।
তিনি বলেন, পাম্পে চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় বাইরে থেকে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। একই সঙ্গে ডিজেল সংকটের কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধা-পাকা ধান কাটা শুরু করেছেন বলেও জানান তিনি।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠ সেন গুপ্তা বলেন, চলনবিল এলাকায় ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকেরা যেন নির্বিঘ্নে সেচ দিতে পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের জন্য কার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কার্ড নিয়ে পেট্রোল পাম্পে গেলে কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক সময় কৃষকেরা চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, চলনবিল এলাকার কৃষিখাতের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ কাজ করছে। প্রকৃত কৃষকেরা যেন ঠিকভাবে ডিজেল সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলনবিল এলাকায় বোরো আবাদে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো মৌসুমে নিয়মিত সেচ নিশ্চিত না হলে ফলন কমে যেতে পারে। ফলে শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, পুরো অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে চলনবিলের বোরো উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।