দেশে ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা থাকলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর জ্বালানি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। অনেক পাম্পে তেল বিক্রির ওপর সীমা নির্ধারণ করে দেওয়ায় বাড়তি দাম দিয়েও কাটছে না ভোগান্তি। অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় রাইডশেয়ারের মোটরসাইকেলের ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে নগরবাসীর খরচের বোঝা আরওে বাড়লো। গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প সরেজমিনে ঘুরে ও ভাড়ায় চালিত রাইডশেয়ারিং বাইকারদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র জানা যায়। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে অনেক পাম্প এখনো তেল বিক্রিতে সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে। অর্থাৎ, বাড়তি দাম দিয়েও গ্রাহক তার চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না।
মহাখালীর ক্লিন ফুয়েল স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বাইকারদের লাইন মহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এত ভিড়ের মধ্যেও স্টেশন কর্তৃপক্ষ ৬০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। অথচ দাম বাড়ার আগে এই ৬০০ টাকায় যেখানে ৫ লিটার তেল পাওয়া যেত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.২ লিটারে। বাড়তি টাকা খরচ করেও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়া এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাহকদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের বাজারে চলমান অরাজকতা রোধে সাধারণ গ্রাহকদের একটি বড় অংশই অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, মূল্যবৃদ্ধির পর পাম্পগুলোতে মজুত করা তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেলের দাম বাড়লেও মাঠপর্যায়ের ভোগান্তি কমেনি, বরং ঢাকার অধিকাংশ ফুয়েল স্টেশনে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের লাইন কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে।
মো. কামরুল ইসলাম নামের এক বাইকার বলেন, সকাল ৮টা থেকে লাইনে অপেক্ষা করে বিকেল সাড়ে চারটায় তেল পেয়েছি। তাও চার লিটার। আরেক বাইকার মাসুম বিল্লাহ বলেন, তেলের দাম বাড়ালো, সেই টাকাটা আমাদের পকেট থেকেই যাবে। অথচ বাড়তি দাম দিয়েও ভোগান্তি কাটছে না। অন্যান্য দিনের মতো আজও ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশনে অপেক্ষমাণ গ্রাহকদের লাইন জাহাঙ্গীর গেট ছুঁইছুঁই। ফুয়েল পাস থাকলে ১,২০০ এবং পাস না থাকলে ১,০০০ টাকার তেল দিচ্ছে স্টেশনটি। তেল নিতে আসা বাইকার আসাদুজ্জামান বলেন, সকাল সকাল তেল নিতে এসেছি, কিন্তু কখন পাব জানি না। দাম বাড়িয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু তেলটা পেতে যেন ভোগান্তি কম হয়, এটাই চাই। আরেক বাইকার এনামুল বলেন, ভেবেছিলাম মূল্যবৃদ্ধির পর তেলের সরবরাহ বাড়বে, ভোগান্তি কিছুটা কমবে। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। সেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে যেতে হচ্ছে।
তেলের দাম বাড়ায় রাইডশেয়ারের মোটরসাইকেলে বেড়েছে ভাড়া: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার দিন থেকেই রাজধানীর রাইডশেয়ারকারী বাইকাররা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ে যাতায়াত এখন অনেকের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে স্বল্প দূরত্বের যাত্রাও এখন নগরবাসীর জন্য বাড়তি খরচের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর মধ্য বাড্ডার বাসিন্দা হাসান গতকাল দুপুরে ব্যক্তিগত কাজে বাড্ডা লিঙ্ক রোড থেকে পুরানা পল্টন যেতে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং নিতে গিয়ে পড়েন বিপাকে। নিয়মিত যাতায়াতের অভিজ্ঞতায় তিনি ভাড়া ১৫০ টাকা বললেও চালক ২০০ টাকার নিচে যেতে রাজি নন। একই পথে আরও কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বললেও কেউ ২০০, কেউ ২২০ টাকা দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে ২০০ টাকায়ই যাত্রা শুরু করেন তিনি।
তেলের দাম বাড়তেই ভাড়ায় ‘চেইন রিঅ্যাকশন’: আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার গতকাল থেকে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। গত শনিবার রাতে বিজ্ঞপ্তিতে এপ্রিল মাসে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রোলে ১৯ টাকা এবং কেরোসিনে ১৮ টাকা করে বেড়েছে। এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরের পরিবহন খাতে। জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনে এই মূল্য সমন্বয়ের পরপরই বাজারে ভাড়ার চাপ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
এলাকাভেদে ভাড়া বেড়েছে: মাঠপর্যায়ের খোঁজে জানা গেছে, জ্বালানি সংকট ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে স্বল্প দূরত্বে মোটরসাইকেল ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগের ভাড়ায় এখন আর কোনো চালক গন্তব্যে যেতে রাজি হচ্ছেন না। যাত্রীদের দরকষাকষির সুযোগও কমে গেছে। বিশেষ করে অফিস সময় ও ব্যস্ত এলাকায় ভাড়া আরও বেশি চাওয়া হচ্ছে।
সংকট শুধু দামে নয়, সরবরাহেও: চালকদের অভিযোগ, শুধু দামই বাড়েনি, তেলের সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দাম বাড়ানোর পরও বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি চালকদের মধ্যে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
যাত্রীদের ওপর বাড়তি চাপ:মোটরসাইকেলভিত্তিক রাইড দ্রুত যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হলেও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে তা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে দৈনিক যাতায়াত ব্যয় বাড়বে, বিকল্প পরিবহন খুঁজতে হবে এবং সর্বোপরি সময় ও ভোগান্তি বাড়বে।