নওগাঁর রাণীনগরে বিয়ে রেজিস্ট্রির ৮মাস পর বয়স পরিবর্তন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বিষয়টি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে উপজেলার কথিত ও সমালোচিত কাজী মো: বেলাল হোসাইনের এমন কান্ড নতুন করে তার অবৈধ কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অপরদিকে উপজেলা প্রশাসনের নাগের ডগায় বসে বছরের পর বছর বিয়ে রেজিস্ট্রির অবৈধ বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসলেও এবং একাধিক লিখিত অভিযোগ পেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজী মো: বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আইনগত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কতিথ কাজীর ফাঁদে পড়ে এবং না জেনে এমন সব অবৈধ বিয়ের কাজ সম্পন্ন করার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে নষ্ট হচ্ছে শত শত সংসার এবং বাড়ছে মামলার জট ও সাংসারিক দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি কাজী মো: বেলাল হোসাইন নওগাঁ সদর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের চুনিয়াগাড়ি গ্রামেও একটি বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজ সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে যে, গত ২০২৫সালের আগস্ট মাসের ১৩তারিখে উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের লতিফের মেয়ে তাছিন ফাতেমা লামমির সঙ্গে পাশ^র্বতি বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়নের ঢেকড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে আসলাম হোসেনের সঙ্গে হওয়া বিয়ে রেজিস্ট্রি করে কথিত কাজী মো: বেলাল হোসাইন। ০৭-০৬-২০২২ তারিখে প্রদান করা কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের জন্মনিবন্ধনে মেয়ে লামমির বয়স উল্লেখ্য করা হয় ২৫-০৪-২০১২। যার রেজিস্ট্রি নম্বর: ২০১২৬৪১৮৫৫২১০৪৯৮৮। সেই বয়স অনুসারে মেয়ে লামমির বিয়ের বয়ম না হওয়ায় কাজী মো: বেলাল হোসাইন অর্থের বিনিময় একটি চক্রের মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে মেয়ে লামমির নামে শুধু ফাতেমা নামে একটি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে। যেখানে মেয়ে লামমির বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ২৫-০৪-২০০৭। যার রেজিস্ট্রি নং ২০০৭২৬৯২০৬২০৬৬৬৭২ এবং ইস্যুর তারিখ ০১-০৪-২০২৬ যা সম্পন্ন ভুয়া। সম্প্রতি এই বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। অপরিদকে অর্থের বিনিময়ে বিয়ের কাবিন নামায় দেনমোহরের পরিমাণ দুই রকম করায় এক পক্ষ আইনের আশ্রয়ে যাওয়া প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এমন কাজগুলো কাজী মো: বেলাল হোসাইন রাণীনগর উপজেলা পরিষদের প্রধান গেটের সামনে তার মা কম্পিউটার নামে স্থাপন করা একটি দোকান ঘর থেকে পরিচালনা করে আসছে। বছরের পর বছর কাজী মো: বেলাল হোসাইন এমন অবৈধ কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসলেও প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরব ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উপজেলার চকমনু গ্রামের মৃত-ইব্রাহিম আলীর ছেলে রেজাউল ইসলাম জানান, কাজী মো: বেলাল হোসাইন ২নং কাশিমপুর ইউনিয়ন নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে পাওয়ার পর হতে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বাল্যবিবাহ নিবন্ধন, নিবন্ধনকালীন সময়ে এক পক্ষের নিকট হতে অর্থের বিনিময়ে মোহরানা বৃদ্ধি করেন। এসব বিষয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলে সে টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে আসছে। সে বিগত সময় নিজেকে আ’লীগের দোসর সাজিয়ে বহাল তবিয়তে এমন অবৈধ কাজ করে, অনলাইন জুয়া ও অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছে। তার এমন অনৈতিক কাজে এলাকার সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত একাধিক ফৌজদারী মামলা চলমান রয়েছে। তার এমন কার্যকলাপে বহু সংসারে অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনাও ঘটছে।
তিনি আরো বলেন, প্রশাসন খবর পেয়ে যেগুলো বাল্য বিয়ে বন্ধ করে দেয় পরে অর্থের বিনিময়ে কাজী বেলাল গোপনে সেই বিয়ে নিবন্ধন করে দেয়। সে নিজে এবং তার ভাগিনা, ভাই ও সন্তানকে দিয়ে বেআইনী ভাবে নিজ এলাকার বাহিরে গিয়ে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করে। এই কাজে সে একাধিক ডুপ্লিকেট বই ব্যবহার করে। বর্তমানে সে অত্র অঞ্চলে অবৈধ বিবাহ বিশারদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অতিদ্রুত বেলাল হোসাইনের বিরুদ্ধে আইনত অভিযোগের সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন রেজাউল ইসলাম।
এই বিষয়ে কাজী মো: বেলাল হোসাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলে তা রিসিভ না হওয়ায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার ও কাজী সমিতির সভাপতি এটিএম রেজাউল ইসলাম বলেন, একজন কাজীর পায়ের শিকল হচ্ছে তার নিজ এলাকা। আর কাজী বেলাল হোসাইন ২০১২সালে সাবেক এমপি ইসরাফিল আলমকে ম্যানেজ করে অন্য এলাকার বাসিন্দা হয়েও কাজী বেলাল নিজেকে অবৈধ ভাবে কাশিমপুর ইউনিয়নের কাজী বানিয়ে নেয়। এরপর থেকে কাজী বেলাল অর্থের বিনিময়ে আ’লীগের ছত্রছাঁয়ায় থেকে সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে এখন পর্যন্ত অবৈধ কাজ করে আসছে।
তিনি আরো বলেন, এই বিষয়ে বহুবার জেলা ও উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা সভায় অভিযোগ আকারে বলে কোন লাভ হয়নি। একাধিকবার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত ভাবে জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। তবে সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে কাজী বেলালের দৌরাত্ম বন্ধ করা খুবই জরুরী। তা না হলে তার দ্বারা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হতেই থাকবে আর সংসারেও অশান্তি সৃষ্টি অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান জানান এমন বিষয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।