মিশ্র ফল বাগানে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সফল কৃষক মিনার, ১৪ হাজার টাকায় ৩ কুটির প্রজেক্ট

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সয়বাদদাতা

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ বিলেরপার গ্রামে চারিদিকে হ্রদ বেষ্টিত একটি পাহাড় এলাকায় উচু টিলায় বসতবাড়ির চারপাশে

2026-04-12T18:52:03+00:00
2026-04-12T18:52:03+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬,
২৪ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
মিশ্র ফল বাগানে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সফল কৃষক মিনার, ১৪ হাজার টাকায় ৩ কুটির প্রজেক্ট
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সয়বাদদাতা
প্রকাশ: রোববার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৫২ পিএম 
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ বিলেরপার গ্রামে চারিদিকে হ্রদ বেষ্টিত একটি পাহাড় এলাকায় উচু টিলায় বসতবাড়ির চারপাশে প্রায় ১০ একর পাহাড়ি ঢালু জমিতে ময়নুল ইসলাম মিনার গড়ে তুলেছে পরিকল্পিত মিশ্র ফল বাগান। আম, কাঁঠাল, কুল, লিচু, আমলকী, পেঁপে, তেতুল, মাল্টা, জাম্বুরা, নারিকেল, সুপারি, কলা, আনারসসহ তার এ বাগানে রয়েছে প্রায় ২০/২৫ প্রজাতির ফল গাছ। এছাড়াও ফল বাগানের মধ্যবর্তী স্থানে বিভিন্ন মৌসুমি ফসল যেমন- শাকসবজি, ধনিয়া, আদা ইত্যাদি থেকেও আসে বাড়তি আয়। 

ময়নুল ইসলাম মিনার বলেন, ২০১৫ সালে পরিকল্পিত ফল বাগান স্থাপনের পূর্বে লেখাপড়ার পাশাপাশি এক প্রকার বেকারই ছিলাম। তখন এইচ এসসি পরীক্ষা চলাকালে পৌরনীতি বইয়ের মধ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নামে সরকারী একটি সংস্থার বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে দেখা যায়। এরপর থেকে আগ্রহ জাগে যুব উন্নয়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহনের। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর মৌৗলভীবাজার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অফিসে গিয়ে তথ্য নিয়ে জানতে পারেন ৭২তম ব্যাচের প্রমিক্ষণে ভর্তি হই। এ প্রশিক্ষণের শিরোনাম ছিল “ গবাদিপশু, হাঁস মুরগী পালন, মৎস্যচাষ ও কৃষি বিষয়ক”।  

এ প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কৃষি বিভাগের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং উপকরণ সহায়তা পেয়ে আজ মিনার একজন সচ্ছল কৃষক, সফল কৃষি উদ্যোক্তা এলাকায় অনুসরণীয় আদর্শ। ১৪ হাজার টাকার পূজি নিয়ে নিজ গ্রামে কৃষিতে মনোযোগি হয়ে বাগানের ফসলের উৎপাদনে ১০ বছরের ব্যবধানে ২ কোটি ৯৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার প্রজেক্ট দাড়িয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে গরুর খামারে বর্জ পছিয়ে গ্যাস তৈরী করে নিজের রান্নার কাজে ব্যবরূত করছে মিনার। আগামীতে নিজের তৈরী গ্যাস এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে আরও আয় করে লাভের পরিমান প্রতি বছর উল্লেখ যোগ্য হারে বাড়বে এমনটাই আশা করছেন সফল উদ্যোক্তা মিনার।

এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে খামার সম্প্রসারণ আর্থিক সহযোগিতা রাস্তাঘাটের উন্নয়নমূলক কাজ বৃক্ষরোপণ অসহায়দের মাঝে খাবার বিতরণসহ রয়েছে সামাজিক নানামুখী কর্মকান্ডে তার অবদান। তার উদ্যোগেই এলাকায় প্রায় ৩০ টির অধিক ব্রয়লারের খামার গড়ে উঠেছে যার ফলে দুর হয়েছে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান। এছাড়াও সামাজিক কর্মকান্ডে রয়েছে ব্যাপক অবদান। 

সরেজমিন ময়নুল ইসলাম মিনারের মিশ্র ফল বাগান পরিদর্শন করে দেখা যায়, উঁচু টিলায় বসতঘর তৈরি করে তার চারপাশে গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের মিশ্র ফল বাগান। পুরো বাড়ির আঙ্গিনার চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ফলের গাছ রয়েছে। রয়েছে গবাদি পশু, পোল্ট্রি ফার্ম। বর্তমানে তার মিশ্র ফল বাগানের আম গাছে প্রচুর ফল ধরেছে। আগামীতে কয়েক লক্ষ টাকার ফল বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন সফল উদ্যোক্তা মিনার। মিনারে মিশ্রফল বাগানে হাড়ি ভাংগা, আম রুপালী, বারি-৪, লিচু, কলা, ড্রাগন ফল, আনারস, জাম, পেপে, পিয়ারা ও ভিয়েতনাম নারিকেল, সুপারীসহ বিভিন্ন জাতের ১২ হাজার ৫শ’ ৪২টি গাছ রয়েছে। পাশাপাশি বয়লার মোরগ, হাস, গরু ও ছাগল রয়েছে ২ হাজারেরও বেশি। 


ময়নুল ইসলাম মিনার আরোও বলেন, যুব উন্নয়নের ট্রেনিং এর পর বাবার দেয়া ১৪ হাজার টাকা ও যুব উন্নয়নের ডেপুটি কোঅর্ডিনেটের মজিবুল আলম স্যারের আর্থিক সহযোগিতায় ১ হাজার ব্রয়লারের খামার নিয়ে কর্ম জীবন শুরু। এর পর ধীরে ধীরে খামার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বর্তমানে উনিশ হাজার ব্রয়লার এক লক্ষ দশ হাজার আনারসের, ২৩০ গাছ আম, ১০ গাছ লিচু ও গরু ছাগল খামারসহ আর বিভিন্ন ফল ফুলের বাগান রয়েছে। ১৪ হাজার টাকার পূজি দিয়ে বর্তমানে ২ কোটি ৯৪ লক্ষ্য ৮০ হাজার টাকার প্রজেক্ট তৈরী হয়েছে। রয়েছে ১ হেক্টর ধান ক্ষেত। 

মিনার আরও বলেন, বাগানসহ খামারে বাৎসরিক ৮ জন ও দৈনিক ১৮ জন শ্রমিক এর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ খামরে বিগত করোনা কালীন সময়ে ২২ লাখ টাকা লোকসান ও ২০২৪ এর ৫ আগস্ট এর পরবর্তী সময়ে ব্যবসায় প্রায় ৫৭ লাখ টাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হলেও হাল ছাড়েনি বলে জানান মিনার। তার বাগানের আম সম্পর্কে বলেন, পাহাড়ের লাল মাটিতে আম খুব ভালো হচ্ছে। আমার বাগানে ২৩০টির মত গাছে আম ধরেছে এগুলো বিক্রির সময় প্রায় ৫/৬ লাখ টাকার আম বিক্রি হবে বলে আশাবাদি। এ ফল চাষে তেমন কোন পরিচর্যা বা খরচ না থাকলেও বেশ ভালো আয় করা যাবে। আমার ফল গাছে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর সার, কম্পোস্ট সার বেশি ব্যবহার করি। আর শুষ্ক মৌসুমে গাছের গোড়ায় খড়, শুকনা আগাছা আবর্জনা দিয়ে জাবড়া দিয়ে দেই। 

মিনার আরও বলেন, এ বাগান গড়ে তোলার পর স্থানীয় অনেক বেকার যুবক কাজের সন্ধান পেয়েছেন। আমার নিজের যেমন আয় বেড়েছে অন্যদিকে এলাকার মানুষও ভেজালমুক্ত, রাসায়নিকমুক্ত ফল ও শাকসবজি পাচ্ছেন। আমি মনে করি এতে মানুষের সেবা করাও যাচ্ছে। চাকরির পেছনে না ছুটে বেকার জীবন কাটানোর চেয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হলে সমাজে বেকার মানুষের সংখ্যা কমে আসবে, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। 

নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ায় এলাকায় বেশ প্রশংসিতও হচ্ছেন কৃষক ময়নুল ইসলাম মিনার। অনেকেই এখন তার মত বাগান গড়ে তোলার কথা ভাবছেন। দেখছেন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন। এজন্য কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ থেকে সহায়তা পাওয়ার কথা বলছেন মিনার। 

ভবিষ্যতে এ বাগানে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বিদ্যমান বিভিন্ন ফল গাছের ফাঁকে ফাঁকে সম্ভাবনাময় ফসল মাল্টা, কমলা বাগান স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান মিনার। শুষ্ক মৌসুমে উঁচুতে সেচ দেওয়ার জন্য ড্রিপ ইরিগেশন উপকরণ, সোলার সেচ পাম্প, ফসল প্রদর্শনী স্থাপন ইত্যাদি সহায়তা পেলে সেখানেও বাণিজ্যিক মিশ্র ফল বাগান স্থাপন করবেন এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রচেষ্টা থাকলে সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে সামনে যে এগিয়ে যাওয়া যায় মিনার দৃষ্টান্ত সে বার্তাই দিচ্ছে এলাকার আগ্রহী সকল কৃষকদের মাঝে। এলাকার কৃষকদের সমস্যা সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উপযুক্ত সহায়তা প্রদান করা গেলে অদুর ভবিষ্যতে অনাবাদি পতিত টিলা প্রচলিত আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের আমুল পরিবর্তন ঘটবে, ঘটবে কৃষি বিপ্লব। এক একটি উচু টিলা এক একটি বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হবে।

একই এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুছ জানান, মিনারের বাগানে বিভিন্ন মৌসুম এলে বাগান পরিচর্যার কাজে নারী-পুরুষ অনেকেই কাজের সুযোগ পান। গ্রামের দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানেও তার ভূমিকা রয়েছে। সব মিলিয়ে মিনার আমাদের গ্রামের একজন সফল মানুষ। কুলাউড়া উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মনোরঞ্জন সিংহ বলেন, কৃষক ময়নুল ইসলাম মিনার এলাকার একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি একজন আধুনিক কৃষি জ্ঞানসম্পন্ন কৃষক। কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই তাকে বাণিজ্যিক মিশ্র বাগান করার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। এছাড়া বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা ও সম্প্রসারণ কর্মকান্ডে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়। প্রত্যন্ত এলাকায় এভাবে কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে উঠার জন্য তিনি একজন প্রকৃষ্ট উদাহরণ।



Loading...
Loading...

- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: