দেশের ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তজুড়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে সংস্থাটি ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে শুরু করেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫ হাজার ৪২৫ লিটার অবৈধ ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়েছে, যা বাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজিবির সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ফেনী, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এসব তেল জব্দ করা হয়। সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের অবৈধ মজুত ও পাচারের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ১৭৭ লিটার এবং ২০২৫ সালে ৩০ হাজার ৯২ লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে গত তিন বছরে উদ্ধারকৃত তেলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ২৬৯ লিটার। সাম্প্রতিক এক অভিযানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। বিজিবির নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি) এবং র্যাবের যৌথ অভিযানে তারাবো কাজীপাড়া এলাকায় দুটি গুদাম থেকে প্রায় ২ হাজার লিটার খোলা সয়াবিন তেল জব্দ করা হয়। অভিযানে দেখা যায়, স্থানীয় বাজার থেকে খোলা তেল সংগ্রহ করে অবৈধভাবে মজুত ও বোতলজাত করা হচ্ছিল। পরে ‘বন্ধন প্লাস’ ও ‘বিসমিল্লাহ’ নামের স্টিকার লাগিয়ে তা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছিল, যা সরাসরি ভোক্তা প্রতারণার শামিল।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। খোলা ও অপরিশোধিত তেল অনিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও পুনঃপ্যাকেজিংয়ের ফলে এতে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান মেশার আশঙ্কা থাকে। ফলে ভোক্তারা অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পাচার ঠেকাতে নিয়মিত টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। চোরাচালানে ব্যবহৃত রুট শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। সন্দেহভাজন যানবাহন, নৌযান এবং সীমান্তবর্তী গুদামগুলোতে তল্লাশি কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
শুধু এককভাবে নয়, এ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে বিজিবি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও শুল্ক বিভাগের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সীমান্তবর্তী ৮ কিলোমিটারের বাইরেও এসব অভিযান বিস্তৃত করা হচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই পাচারকারীরা সুযোগ নিতে না পারে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। সীমান্তবর্তী এলাকার জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে ভোজ্যতেল পাচারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হচ্ছে। সবাইকে এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজিবির এ ধরনের কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকলে শুধু ভোজ্যতেলের বাজারই নয়, সামগ্রিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা সুরক্ষিত থাকবেন, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতাও কমে আসবে।