সক্ষমতা দ্বিগুণ-তবুও সংকট, বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রীষ্ম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে শহর-গ্রাম। এর

2026-04-06T20:36:26+00:00
2026-04-06T20:36:26+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬,
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বিদ্যুৎ খাতের জটিল সমীকরণ
সক্ষমতা দ্বিগুণ-তবুও সংকট, বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ
শাকিল আহমেদ
সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:৩৬ পিএম 
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রীষ্ম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে শহর-গ্রাম। এর মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে জ্বালানির তীব্র ঘাটতি, যা আবার বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।        মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।      আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস, কয়লা ও তেলের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। এই চাপ এসে পড়েছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সরকারি হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চলতি গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হচ্ছে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ কাগজে-কলমে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি না থাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

গত শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই ভোগান্তি বেশি।
জ্বালানি আমদানির চাপ : বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনো বকেয়া, প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের চাপ রয়েছে। এর ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। তেল ও এলএনজি আমদানিতে এক মাসেই প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে। ডলারের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এমন অবস্থায় সরকার জ্বালানির দাম বাড়ানোর চিন্তাও করছে।

চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
এপ্রিল ও মে, এই দুই মাসে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে। তাই সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি চাহিদা নিয়ন্ত্রণের দিকেও জোর দিচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে সন্ধ্যার পর দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারে সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ধাক্কা : দেশে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু কয়লার সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বড় অংশের বিদ্যুৎ আসার কথা থাকলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, যা দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র; তার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। একইভাবে মাতারবাড়ী কেন্দ্রও কয়লার অভাবে অর্ধেক উৎপাদনে সীমাবদ্ধ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে অন্তত এক সপ্তাহ লোডশেডিং অব্যাহত থাকতে পারে।

গ্যাস সংকট: বড় ধাক্কা : এদিকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভর করে গ্যাসের ওপর। কিন্তু এখানেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। গ্রীষ্মকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে হলে বিদ্যুৎ খাতে অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সরবরাহ হচ্ছে এর চেয়ে অনেক কম। ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ক্রমেই কমছে। ফলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত।

সম্ভাব্য লোডশেডিং চিত্র : বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গ্যাস সরবরাহ ৯০ কোটি ঘনফুটে নামলে প্রায় ১ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হতে পারে। এতে দিনে গড়ে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে। আরও খারাপ পরিস্থিতিতে এই লোডশেডিং কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়।
তেলচালিত কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা : গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি পূরণে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করার কথা থাকলেও সেখানেও সমস্যা রয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি তেল কিনতে হিমশিম খাচ্ছে এসব কেন্দ্র। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।

‘অদৃশ্য’ সক্ষমতার বাস্তবতা : দেশে মোট ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সবগুলো একসঙ্গে চালু রাখা সম্ভব নয়। গ্যাসের অভাবে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অলস পড়ে থাকে। ডিজেল ও সৌরবিদ্যুৎ রাতের বেলায় কার্যত অকার্যকর। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে থাকে অন্তত ১.৫ হাজার মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে কার্যকর সক্ষমতা নেমে আসে প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াটে। এই সীমিত সক্ষমতা দিয়েই চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।

অতীতের পুনরাবৃত্তি : গত দুই গ্রীষ্ম মৌসুমেও দিনে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়েছিল। এবারও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বৃষ্টিপাত হলে তাপমাত্রা কমে গিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা কমতে পারে, যা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। এমতাবস্তায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভর্তুকি বা দাম বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং জ্বালানি খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, দক্ষতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় সংকট বারবার ফিরে আসবে।

এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে। এরই মধ্যে সরকার একদিকে আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং ডলার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশে বিদ্যুৎ সংকটের মূল সমস্যা উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহের দুর্বলতা। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে এক জটিল বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ খাত। এই সংকট কাটাতে হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: