শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যয়ের শঙ্কা: অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনায় অভিভাবকদের ক্ষোভ

সোহাগ রাসিফ

জাতীয়

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া ‘ব্যয় সংকোচনমূলক নীতি’র বড় প্রভাব পড়ছে দেশের

2026-04-05T11:43:47+00:00
2026-04-05T11:43:47+00:00
 
  শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
জাতীয়
শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যয়ের শঙ্কা: অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনায় অভিভাবকদের ক্ষোভ
জ্বালানির নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
সোহাগ রাসিফ
প্রকাশ: রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম 
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নেওয়া ‘ব্যয় সংকোচনমূলক নীতি’র বড় প্রভাব পড়ছে দেশের শিক্ষাখাতে। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও আংশিক অনলাইন পাঠদান চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের এমন পরিকল্পনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এ নিয়ে তারা সরকারের কাছে বিকল্প প্রস্তাবও পেশ করেছেন। অনলাইনে পাঠদান চালু হলে শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যয়ের শঙ্কাও করছেন শিক্ষাবিদরা। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে এই পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সকল বিষয় বিবেচনা করে আজ রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জানাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগামী রোববার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত আলাদা নির্দেশনা দেওয়া শুরু করবে। তবে শিক্ষা কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, তা বিবেচনায় রাখা হবে।

সপ্তাহে ৩ দিন অনলাইন ক্লাসের প্রস্তাবনা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ করে মহানগরী এলাকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাসের মধ্যে ৩ দিন অনলাইনে এবং ৩ দিন সশরীরে (অফলাইন) পাঠদান করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ‘৩+৩’ মডেলে এক দিন অনলাইনে ক্লাস হলে পরবর্তী দিন সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান হবে। তবে অনলাইনে ক্লাস চলাকালীন শিক্ষকদের সশরীরে স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে এবং সব ধরনের ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস সরাসরি স্কুলেই অনুষ্ঠিত হবে। প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্ত কেবল সিটি করপোরেশন এলাকার বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর জন্য প্রযোজ্য হতে পারে।

তীব্র ক্ষোভে অভিভাবকদের বিকল্প প্রস্তাব: সরকারের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পেরেন্টস ফোরাম’ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি এ কে এম আশরাফুল হক জানান, মে মাসে সাধারণ স্কুলগুলোর সেশন ফাইনাল এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর ‘ও’ ও ‘এ’ লেভেল পরীক্ষা রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সশরীরে ক্লাস বন্ধ করলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ধস নামবে।

অভিভাবকরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ৪টি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেছেন। যা হলো: ১. প্রস্তাবিত ৩+৩ মডেল (অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়) পুরোপুরি বাতিল করা। ২. সপ্তাহে ৪ দিন সরাসরি ক্লাস চালু রেখে বাকি তিন দিন স্কুল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা (যাতে যাতায়াত ও বিদ্যুৎ উভয়ই সাশ্রয় হয়)। ৩. স্কুলের প্রতিদিনের কার্যঘণ্টা বা ক্লাসের সময় কমিয়ে আনা। ৪. শ্রেণিকক্ষে এসির ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার নিশ্চিত করা। 

এছাড়া বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিভাইসের বাড়তি খরচ বহন করা সাধারণ অভিভাবকদের জন্য বড় আর্থিক চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে বলেও জানান অভিভাবকরা।

শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যয়ের শঙ্কা: শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, করোনাকালের ‘লার্নিং গ্যাপ’ বা শিখন-ঘাটতি এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদিও করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না। জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করে কীভাবে শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা যায়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তারা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান ভোরের ডাককে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে আমরা ‘অনলাইন’কে সবসময় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রাখি। কিন্তু বিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোমলমতি। তাদেরকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে রেখে পাঠদান করা হলে পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনা কষ্টকর হয়ে উঠবে। শ্রেণিকক্ষে শুধুমাত্র পড়াশোনাই শেখানো হয় না, এখানে ভালো মানুষ হওয়াটাও শেখানো হয়। তিনি বলেন, বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাস করলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, এটা ভাবাও ভুল। আমি মনে করি অন্য খাতে জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে বিদ্যালয়ে সরাসরি ক্লাস নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। না হয় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনলাইন ক্লাস কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এটি শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি করবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাবে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। ব্র্যাকের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ মনে করেন, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ক্লাসবিমুখ’ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক নূর-এ-আলম সিদ্দিকী পরামর্শ দিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে বরং স্কুলের সময় এগিয়ে এনে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা উচিত।

সরকারের অবস্থান ও বিকল্প উদ্যোগ: শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, একটি জরিপে প্রায় ৫৫ থেকে ৮৫ শতাংশ মানুষ আংশিক অনলাইন শিক্ষার পক্ষে মত দিলেও সরকার শিক্ষার্থীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় নতুন বৈদ্যুতিক বাস বা ‘ইলেকট্রিক বাস’ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি মহানগরীগুলোতে ট্রাফিক জট ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: