দেশে আশঙ্কাজনক হারে মাদক প্রবেশ ও বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের বড় একটি অংশ ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই মাদকাসক্তিই এখন রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা, রায়েরবাজার, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে থাকে রামদা, চাপাতি, ছুরি ও নানা ধরনের অস্ত্র। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় দেহ বিকৃত করার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে, যা সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাদের হাতে বই থাকার কথা, তাদের অনেকেই এখন মাদক পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, কথিত ‘বড়ভাই’, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও ভূমিদস্যুদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব কিশোর গ্যাং।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ইয়াবা সেবনের ফলে কিশোরদের আবেগ, সহমর্মিতা ও মানবিকতা কমে যায়। তারা ক্রমশ সহিংস ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, তার কাছে আসা অনেক কিশোর রোগী জানিয়েছে, এলাকার বড়ভাইদের হয়ে মাদক বিক্রি করতে গিয়েই তারা আসক্ত হয়েছে। বিনামূল্যে মাদক পাওয়ার সুযোগ তাদের দ্রুত এই পথে টেনে নেয়। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন মাদকাসক্ত থাকলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে দেশব্যাপী মাদক ও কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু করেছে। পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও দৃশ্যমানভাবে অপরাধ কমেনি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় সহজেই জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের প্রবেশ বন্ধ না করা গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজধানীর কিছু এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্পসহ কয়েকটি এলাকা মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও অসাধু ব্যক্তিদের সহযোগিতায় এসব ব্যবসা টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসন—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, সমাজে মাদক যত সহজলভ্য হবে, ততই বাড়বে মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতা। তাই কিশোর গ্যাং দমনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো মাদকের বিস্তার রোধ করা এবং তরুণ সমাজকে সুস্থ ও ইতিবাচক পথে ফিরিয়ে আনা।