নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পালশা এলাকায় অবস্থিত নূর বানু ফিলিং স্টেশনকে কেন্দ্র করে তীব্র জ্বালানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। উপজেলায় একমাত্র তেলের পাম্প হওয়ায় এই সংকট এখন স্থানীয় জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন শত শত মানুষ তেলের আশায় ভিড় জমালেও অধিকাংশই হতাশ হয়ে ফিরছেন। ফলে পুরো এলাকায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন বিকেলে তেল সরবরাহ করা হলেও গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না। আগে থেকেই ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে কয়েকশ মিটার ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। যারা তেল পাচ্ছেন, তাদের মোটরসাইকেল প্রতি মাত্র ২০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে দৈনন্দিন যাতায়াত ও পেশাগত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর আলী বলেন, “তিন দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাইনি। এত কষ্ট করেও নিশ্চিত নই তেল পাব কি না। অথচ বাজারে বেশি দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে—এই তেল কোথা থেকে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বলেন, “আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। কিন্তু তেলের অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে অফিসে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।”
জ্বালানি সংকটের কারণে স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাও প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনের চালকেরা পর্যাপ্ত তেল না পেয়ে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। এতে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও যাতায়াত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও রোগীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
এদিকে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও সীমিত সরবরাহের কারণে ফিলিং স্টেশন এলাকায় মাঝে-মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
১ এপ্রিল থেকে সরকারি নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি নিশ্চিত করতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্য জানান, “প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মোটরসাইকেল জমা হচ্ছে। তেলের স্বল্পতায় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আমরা নিয়মিত উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।”
উপজেলাটি বিলবেষ্টিত হওয়ায় এখানে ডিজেলচালিত সেচ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও বর্তমানে ডিজেলের সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক, তবুও কৃষকদের অনেক সময় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
স্টেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, উপরমহল থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নূর বানু ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মো. সম্রাট হোসেন বলেন, “আমি ভেবেছিলাম এ মাসে সংকট কিছুটা কমবে, কিন্তু তা হয়নি। যে পরিমাণ তেল আসে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তাই বাধ্য হয়ে সীমিত পরিমাণে তেল দিতে হচ্ছে।”
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, এই সংকট শুধু একটি ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক নয়; বরং এটি বৃহত্তর জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। তারা দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্রাইবাসীর প্রত্যাশা—দ্রুত এই সংকটের সমাধান এবং স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।