
দেশে নতুন বিনিয়োগ কার্যত থমকে গেছে। শিল্প ও ব্যবসা খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না আসায় সামগ্রিক অর্থনীতিও এখন বেশ স্থবির। রুটিন কর্মকান্ডের বাইরে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে যাচ্ছে না সরকার। নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেই বেসরকারি খাতেও। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বর্তমানে কার্যত রুগ্ন। গত কয়েক বছরের সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, যুদ্ধের কারণে তীব্র জ্বালানিসংকট এবং পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট উদ্যোক্তারা। এ পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। জানা যায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেসরকারি খাতে একধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ কম, উল্টো চালু থাকা অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থানে খরা নেমে এসেছে। আর্থিক সংকটের কারণে এক-চতুর্থাংশ ব্যাংক ঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সামষ্টিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, যুদ্ধের কারণে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট এবং ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতির চাপে দেশের বেসরকারি খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতেই এখন বিনিয়োগ কমছে, ঋণপ্রবাহ নেমেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। উদ্যোক্তারা বলছেন, স্থবির অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে নতুন সরকারের সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা জরুরি। অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা-সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা দ্রুত পুনর্গঠন ছাড়া কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের ৭৮ থেকে ৮৬ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশও তৈরি হয় এ খাতেই। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ঋণের সুদহার বেড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে, কমছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার হিসাবে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক মন্থরতা নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। খেলাপি ঋণের হার রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছানো এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, অস্থিরতার মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৬১ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে উৎপাদন কমানো, শ্রমিক ছাঁটাই এবং নতুন প্রকল্প স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমানো ও বেসরকারি খাতকে চাঙা রাখাই বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখন বেসরকারি খাতের দিকে একবারেই নজর দিচ্ছে না। ফলে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানের ঋণও খারাপ হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নজর দেওয়া উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ নিয়মিত করার জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীসহ আরও কিছু ব্যবসায়ীর ঋণ বিশেষ উদ্যোগে নিয়মিত করা হয়েছে। তবে সেই সংখ্যা ১০০-এর মতো। এখনো ১ হাজার ১০০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব ঋণ অবশ্য খেলাপি হয়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রতি মাসেই ঋণে প্রবৃদ্ধি কমছে। গত বছরের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতের ঋণে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর গত ডিসেম্বরে তা ৭ দশমিক ২৮ শতাংশে নামে। পরের মাস জানুয়ারিতে আরও কমে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ হয়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে নেমে যায় ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে। সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে দেশের বেসরকারি খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় কমানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছাড়া বিনিয়োগ ফেরানো সম্ভব নয়। দেশের বেসরকারি খাত স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, উচ্চ নীতিসুদ ব্যবসায়ীদের ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য করছে। এতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তিনি জানান, অনেক কারখানা এখন অর্ধেকের কম সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। ফলে লোকসানের ঝুঁঁকি বাড়ছে।
যুদ্ধে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। ঘন ঘন গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিঘ্নে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানি লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বেসরকারি খাত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ঋণ গ্রহণেও। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিও ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করেছে। তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সময়ে চাঁদাবাজি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। দুর্নীতি ও অস্থিরতা চলতে থাকলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। এখন মুদ্রানীতির লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি কমানো, সেদিকেই বেশি নজর দিচ্ছে সংস্থাটি। তবে বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে দেশের কোনোটাই ঠিক নেই। এখন ব্যবসায়ীরা কেউ বিনিয়োগ করবেন না। তবে যাদের ঋণ খারাপ হয়ে পড়েছে; তাদের নীতিসুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি সুদহার সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।’