পাম্পে পুলিশ, সাব-ডিপোতে বিজিবি, তবুও মিলছে না চাহিদা মতো তেল

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

রাজধানীর ব্যস্ত সকাল। দীর্ঘ সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি, সবই এক উদ্দেশ্যে, জ্বালানি তেল সংগ্রহ। কিন্তু ঘণ্টার পর

2026-03-30T11:10:22+00:00
2026-03-30T13:42:19+00:00
 
  শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬,
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
জাতীয়
ভবিষ্যত সংকট মোকাবিলায় পাঁচ পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
পাম্পে পুলিশ, সাব-ডিপোতে বিজিবি, তবুও মিলছে না চাহিদা মতো তেল
পদে পদে গ্রাহক ভোগান্তি
শাকিল আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ১১:১০ এএম  আপডেট: ৩০.০৩.২০২৬ ১:৪২ পিএম
রাজধানীর ব্যস্ত সকাল। দীর্ঘ সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, সিএনজি, সবই এক উদ্দেশ্যে, জ্বালানি তেল সংগ্রহ। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না কাক্সিক্ষত পরিমাণ। কোথাও সীমিত সরবরাহ, কোথাও হঠাৎ ‘তেল শেষ’ এই বাস্তবতা এখন অনেকটা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে।

রোববার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের চাহিদায়। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চোখে পড়েছে দীর্ঘ লাইন। অনেক চালকের অভিযোগ, সময় নষ্ট হচ্ছে, আয় কমছে, অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

মিরপুরের আসাদ নামে এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষে এসে বলে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া যাবে না। এতে কাজের ক্ষতি হচ্ছে। একই কথা শোনা যায় রাইডশেয়ার চালকদের কাছ থেকেও। তাদের মতে, তেল না পেলে ট্রিপ কমে যায়, আর সেটাই সরাসরি প্রভাব ফেলে আয়ের ওপর। তবে ফিলিং স্টেশন মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা ডিপো থেকে সরবরাহ কম পাওয়া। 

এক পাম্প ব্যবস্থাপক বলেন, আমরা ইচ্ছা করে তেল সীমিত দিচ্ছি না। যতটুকু পাই, সেটুকু ভাগ করে দিতে হয়। না হলে দুপুরের মধ্যেই স্টক শেষ হয়ে যাবে। এদিকে এই সংকটের মধ্যে নতুন একটি প্রবণতাও সামনে এসেছে, একই ব্যক্তি দিনে একাধিকবার তেল সংগ্রহ করছেন। এতে করে প্রকৃত প্রয়োজন থাকা গ্রাহকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ। কিছু ক্ষেত্রে মজুত করে পরে বেশি দামে বিক্রির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যেসব স্থানে ভিড় বেশি এবং উত্তেজনার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মূল লক্ষ্য হচ্ছে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধ। শুধু পাম্পেই নয়, জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাব-ডিপোগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাচার রোধ এবং সরবরাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।

তবু বাস্তবতা বলছে, এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি। বরং চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও তেল পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, কোথাও নির্দিষ্ট সময়ের পর বিক্রি বন্ধ।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বল সমন্বয়। ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত পুরো চেইনে কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যাচ্ছে। চাহিদার পূর্বাভাস এবং বিতরণ পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা হঠাৎ বাড়লে চাপ তৈরি হবেই। কিন্তু সেটি সামাল দেওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি থাকা জরুরি। পরিকল্পনা দুর্বল হলে ভোক্তাদেরই ভোগান্তি পোহাতে হয়।

সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই দাবির অমিল সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রকৃত পরিস্থিতি স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা এবং দ্রুত কার্যকর সমাধান নেওয়া জরুরি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। যারা প্রতিদিনের জীবিকার জন্য যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে গণপরিবহন চালক ও রাইডশেয়ার কর্মীরা, তাদের জন্য এই সংকট বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক দেশ এখন বাড়তি মজুতের দিকে ঝুঁকছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, তারা অতিরিক্ত তেল কেনার পথে হাঁটবে না। ছয় মাসের পরিকল্পনার ভিত্তিতে জিটুজি (সরকারি চুক্তি) ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে তেল আমদানি করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কিছু কৌশলগত পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য : মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তেল আমদানির সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে সরবরাহ ঝুঁকি কমবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি : নতুন রিফাইনারি স্থাপন বা বিদ্যমানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ জরুরি। এতে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে নিজস্বভাবে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, সরবরাহ চেইনের আধুনিকায়ন : ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল মনিটরিং ও ডেটা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা প্রয়োজন, যাতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। চতুর্থত, চাহিদা ব্যবস্থাপনা : সংকটের সময়ে নিয়ন্ত্রিত রেশনিং বা ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পঞ্চমত, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা : জরুরি পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল মজুত রাখা হলে হঠাৎ সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাময়িক ভোগান্তি নয়; এটি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাম্পে পুলিশ ও ডিপোতে বিজিবির উপস্থিতি সংকটের গভীরতাই তুলে ধরছে। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর সমন্বয় এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর ফিরে না আসে এমনটি মত বিশেষজ্ঞদের। 



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: