পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে না বললেও এখন তারা চায়—একবার যুদ্ধ শুরু হলে যেন যুক্তরাষ্ট্র মাঝপথে থেমে না যায়। তাদের আশঙ্কা, ইরান ভবিষ্যতেও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে থাকতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স তিনটি উপসাগরীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যুদ্ধ চলমান থাকুক চাইলেও নিজেরা সরাসরি এতে জড়াতে আগ্রহী নয়। এ কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি দুর্বল না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ বা অনুরোধ জানাচ্ছে।
পাঁচজন পশ্চিমা ও আরব কূটনীতিকের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ দিচ্ছে যেন তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানে আঞ্চলিক সমর্থন দেখাতে চান, যাতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন ব্যাপকভাবে ধারণা তৈরি হয়েছে যে ইরান সব সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, “শুরুতে আমরা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছি। কিন্তু যখন তারা আমাদের ওপর হামলা শুরু করল, তখন তারা আমাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।”
ইরান ইতোমধ্যে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, তেল স্থাপনা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকলে ভবিষ্যতে যে কোনো উত্তেজনায় তারা আবারও তেল সরবরাহকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
এক উপসাগরীয় সূত্র জানায়, আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে এখন ধারণা স্পষ্ট—ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল না করা হলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে থাকবে।
ঐতিহাসিকভাবে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান তার সুন্নি আরব প্রতিবেশীদের সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং যাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তাদেরকে ইরান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলো শুধু অবকাঠামোর ক্ষতি করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ভাবমূর্তিতেও আঘাত হেনেছে। এসব দেশের অর্থনীতি বহুমুখীকরণ ও পর্যটন খাতের বিকাশের প্রচেষ্টাও এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
আবদুলআজিজ সাগের বলেন, “আমেরিকানরা যদি কাজ শেষ করার আগেই সরে যায়, তাহলে আমাদের একাই ইরানের মুখোমুখি হতে হবে।”
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্ত্র উৎপাদন ও নিক্ষেপ সক্ষমতা ধ্বংসে কাজ করছে এবং একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, তারা কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলভুক্ত ছয়টি দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—এখন পর্যন্ত একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছে। তবে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। আঞ্চলিক নেতারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে।