ইয়েমেনের হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন নতুন করে উত্তপ্ত, তখন রিয়াদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে তুরস্ক। সৌদি আরবের প্রয়োজন হলে সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
শনিবার তুর্কি সম্প্রচারমাধ্যম এনটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর হামলা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির কিছু সামরিক প্রয়োজন তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে। সেসব প্রয়োজন পূরণে তুরস্ক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
আঙ্কারার এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে গত আগস্টে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তির মূল নীতিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে চুক্তির আওতায় সৌদিকে তুরস্ক ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, তার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফিদানের বক্তব্যে মূলত প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রয়োজন পূরণের কথা এসেছে; সরাসরি তুর্কি সেনা হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানোর কোনো ঘোষণা তিনি দেননি।
রিয়াদে হুতিদের হামলার দাবি
তুরস্কের এই ঘোষণার মধ্যেই শনিবার সৌদি রাজধানী রিয়াদের কয়েকটি ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। একই সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদমুখী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। দেশটির আরও কয়েকটি এলাকায় হামলার চেষ্টা ঠেকানোর কথাও জানিয়েছে জোটটি।
হামলার দাবির কয়েক ঘণ্টা আগে রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও কালো ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী দেখা যায়। রয়টার্সের ছবি ও ভিডিওতে বিমানবন্দরের আশপাশে আগুনের দৃশ্যও ধরা পড়ে। তবে ওই আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিমানবন্দরটিতে অবশ্য ব্যাপক বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা FlightRadar24-এর তথ্য অনুযায়ী, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়।
কেন সৌদির পাশে তুরস্ক?
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথে হুতিদের হামলা বেড়েছে। জুলাইয়ে রিয়াদের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এর প্রভাব পড়ছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও।
হুতিদের অগ্রগতি সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশে তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের অবস্থান কী?
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির তৃতীয় অংশীদার পাকিস্তানও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে সৌদিতে হুতিদের হামলার জবাবে ইসলামাবাদ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি বলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে দেশটি।
এদিকে ফিদান সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে নতুন কিছু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সৌদি আরবকে এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করা উচিত নয়, যাতে দেশটি নিজে অংশ নিতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, হুতিদের হামলার মধ্যে তুরস্ক সৌদিকে সামরিক সহায়তার প্রস্তুতির কথা স্পষ্ট করেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, আঙ্কারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি; বরং মক্কা চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স