মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিখুঁততা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামরিক ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই লক্ষ্যভেদী সক্ষমতার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা BeiDou Navigation Satellite System।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যে হামলাগুলো চালিয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আগের তুলনায় বেশি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এতে উদ্বেগ বেড়েছে United States ও Israel–এর মধ্যে।
ফ্রান্সের সাবেক গোয়েন্দা পরিচালক Alain Juillet এক পডকাস্টে দাবি করেন, গত বছরের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদী ক্ষমতা অনেক বেড়েছে এবং এর পেছনে চীনের বেইদু সিস্টেম ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের এই স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা ২০২০ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন Global Positioning System (GPS)-এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বেইদু ব্যবস্থায় প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে, যেখানে জিপিএসের স্যাটেলাইট সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বেইদু আরও নির্ভুল অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনায় মূলত জিপিএস এবং নিজস্ব ইনার্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করত। তবে যুদ্ধের সময় জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করা বা বিকৃত করার ঘটনা ঘটতে পারে। এর বিপরীতে বেইদুর সামরিক গ্রেড সিগন্যাল তুলনামূলকভাবে জ্যামিং প্রতিরোধী এবং ভুয়া সিগন্যাল শনাক্ত করার প্রযুক্তি এতে রয়েছে।
চীন–ইরান সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করা বিশ্লেষক Theo Nencini জানান, এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি। ২০১৫ সালে ইরান ও চীনের মধ্যে বেইদু ব্যবহারের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। পরে ২০২১ সালে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে ইরান বেইদুর এনক্রিপ্টেড সামরিক সিগন্যাল ব্যবহারের সুযোগ পায়।
সামরিক বিশ্লেষক Elijah Magnier–এর মতে, বেইদু ব্যবহারের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশে থেকেও গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও ড্রোন বা মিসাইলকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে লক্ষ্যবস্তু সামান্য সরে গেলেও ক্ষেপণাস্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অবস্থানে আঘাত হানতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা ও নেভিগেশন প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু বিকল্প প্রযুক্তির বিস্তার সেই প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষক চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি বাস্তব পরীক্ষাগার হিসেবেও দেখছেন। এতে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট নেভিগেশন ও তথ্য প্রযুক্তির ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।