দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা ম্যানেজিং কমিটির কাঠামোতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। এখন থেকে বেসরকারি স্কুল ও কলেজের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য আর কোনো নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হবে না। এর ফলে জ্ঞানের আলো ছড়ানো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের এইচএসসি কিংবা স্নাতক পাসের বাধ্যবাধকতা বাতিল করে পূর্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবভিত্তিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের রিভিউ সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রবিধানমালা সংশোধনের মাধ্যমে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের একটি সুত্র নিশ্চিত জানিয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ সংশোধনের মাধ্যমে সভাপতির স্নাতক পাসের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হচ্ছে এবং ২০২৪ সালের আগের সেই শিথিল নিয়মই পুনরায় বহাল করা হচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অন্ধকারের পথে হাটার সম্ভাবনা থাকে। শিক্ষার আলো ছড়ানো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা ব্যাক্তিরাই যদি অশিক্ষিত থাকে সেখানে ভাল কিছু আশা করা বিলাশিতা ছাড়া কিছু নয়। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে মূর্খ কেউ প্রভাব খাটিয়ে এই দায়িত্বভার নিলে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ হওয়ার সুযোগ থাকবে। কেউ আবার বলেছেন, সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত ব্যক্তিরা এই দায়িত্ব নিলে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব।
শিক্ষাগত যোগ্যতা পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ প্রেক্ষাপট। ২০২৪ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে প্রথমবার এইচএসসি বা সমমান পাসের শর্তারোপ করে। এরপর উচ্চ আদালতের এক নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এই যোগ্যতা আরও কঠোর করে ন্যূনতম স্নাতক (ডিগ্রি) পাস বাধ্যতামূলক করে গেজেট জারি করেছিল। বর্তমান সরকারের নতুন পদক্ষেপ মূলত সেই স্নাতক পাসের নিয়মটি বাতিল করে দিয়ে স্থানীয় নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জন্য আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ তৈরি করে দিল।
মন্ত্রনালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এক ধরণের প্রশাসনিক ভারসাম্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নিয়োগে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আর আগের মতো একক আধিপত্য বা সরাসরি হস্তক্ষেপের ক্ষমতা থাকছে না। এর পরিবর্তে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক চ্যানেলের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারের সমন্বয়ে যাচাই-বাছাই করে তিনজনের একটি নামের প্যানেল তৈরি করা হবে। এই তালিকা পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে। সেখান থেকে শিক্ষা বোর্ড যাচাই-বাছাই করে একজনকে কমিটির প্রধান বা সভাপতি হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রদান করবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সভায় গৃহীত এই সিদ্ধান্তের আলোকে শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ বা গেজেট জারি করা হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের এই একটি সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের প্রায় ৩৮ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার মাধ্যমিক স্কুল, ৩ হাজার ৩৪১টি কলেজ, প্রায় দেড় হাজার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ৯ হাজার ২৫৯টি মাদরাসা (দাখিল থেকে কামিল পর্যায়) এবং ৫ হাজার ৩৯৫টি কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
স্নাতক পাসের সেই বিশেষ মানদণ্ডটি উঠে যাওয়ায় এখন থেকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবকত্বের আসনে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগে প্রচলিত সেই ব্যবস্থাটিই পূর্ণরূপে ফিরে আসবে, যেখানে সামাজিক প্রভাব ও অভিজ্ঞতাকেই নেতৃত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হতো। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এক নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে, যা জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এবং স্থানীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।