মাঠ ভরা আলু, খাতা ভরা লোকসান, কালাইয়ের আলুচাষিদের ব্যথার মৌসুম

জয়পুরহাট (কালাই) সংবাদদাতা

কালাই উপজেলার ফসলি মাঠগুলো ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কৃষকেরা নেমে পড়েন মাঠে, হাতে মাটি খুঁড়ে তুলে ঝকঝকে

2026-02-28T14:27:46+00:00
2026-02-28T14:27:46+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬,
২৪ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
মাঠ ভরা আলু, খাতা ভরা লোকসান, কালাইয়ের আলুচাষিদের ব্যথার মৌসুম
কৃষকের ঘরে ফিরছে শুধু হতাশা, বাজারে নেই ন্যায্যতা
জয়পুরহাট (কালাই) সংবাদদাতা
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:২৭ পিএম 

কালাই উপজেলার ফসলি মাঠগুলো ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কৃষকেরা নেমে পড়েন মাঠে, হাতে মাটি খুঁড়ে তুলে ঝকঝকে আলু সংগ্রহ করেন। মাঠে ফলন দেখে মনে হয়, এবার হয়ত হাসি ফিরবে কৃষকের মুখে। কিন্তু বিকেলের বাজারে ঢুকলেই সেই আশা ভেস্তে যায়— দাম নেই, টাকা নেই, আছে শুধু লোকসানের হিসাব।

ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না থাকায় কালাইয়ের আলুচাষিরা ঘরে ফিরছেন হতাশার সঙ্গে। তাদের কান্না, ক্ষোভ আর স্বপ্নগুলো যেন বাজারের ন্যায্যতার অভাবে থমকে গেছে। অথচ এই দেশের খাদ্য উৎপাদনকারী এই মানুষরাই দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাত্রাই ইউনিয়নের আলুচাষি জাইদুল ইসলাম বলেন, "আমরা আলু চাষ করি, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সৈনিক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে মাঠে নামি কিন্তু বাজারে যে ভয়াবহ ধস নেমেছে, তাতে আমরা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত না— আমরা ধ্বংসের মুখে।"

উদয়পুর ইউনিয়নের নুনুজ গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, "এবার ৯ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি। খরচ হয়েছে ৬ লাখ টাকা। বাজারে আলুর দাম ২৮০–৩০০ টাকা হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার ক্ষতি হবে। সার, বীজ, কীটনাশক আর শ্রমিকের খরচ আকাশ ছোঁয়া, শুধু দাম নেই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যর।"


উদয়পুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের কৃষক রিপন আক্ষেপ করে বলেন, "প্রতি বিঘায় শুধু মজুরির খরচই পড়ে ৮–৯ হাজার টাকা। তারপরও ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দাম দেয় না। আলু নিয়ে যায়, পরে টাকা দেবেন— এই আশ্বাসেই শেষ। নতুন বস্তার দাম ১০০–১১০ টাকা। আলু তোলার খরচও জোগাড় করতে পারছি না। তাহলে বস্তা কিনব কীভাবে?"

চাষি সুমন্ত চন্দ্র প্রামাণিক যোগ করেন, "বউয়ের গহনা বিক্রি করে আলু চাষ করেছি। বউকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি আলু তুলে বিক্রি করে আবার গহনা কিনে দেব। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি— ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক, যেন বেঁচে থাকার ন্যূনতম স্বস্তি পাই।"

ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, "কোল্ড স্টোরের ভাড়া ৩৫০ থেকে বেড়ে ৪০০ টাকা, বস্তার দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এই খরচে আলু সংরক্ষণ করলেও লসের ভয়। বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই। আমরা কি শুধু লোকসান দেওয়ার জন্যই ব্যাবসা করব?"

মিলন চন্দ্র মহন্ত যোগ করেন, "গত বছর কোল্ড স্টোরে লস হয়েছিল। এবার সাহস করে চাষ করেছি, কিন্তু দাম নেই। নতুন সরকার কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী মৌসুমে আলু চাষ ও ব্যাবসা বন্ধ করতে হবে।"

বর্তমানে কালাই ও আশপাশের বাজারে সাদা জাত প্রতি মণ ২২০–২৩০ টাকা, ভ্যানিলা জাত : ২০০–২১০ টাকা, স্ট্রিক জাত : ৩০০–৩২০ টাকা দরে কেনা-বেচা চলছে। 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা হারুনুর রশীদ জানান, "এ বছর উপজেলায় মোট ১০,৬৯০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন করলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, সরকারের রাজস্বও বাড়বে।"

জয়পুরহাট-২ আসনের এমপি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারি সাংবাদিকদের বলেন, "কীভাবে আলুর দাম বৃদ্ধি করা যায়, কীভাবে আলুকে আরও ব্যবহার করে কৃষককে স্বস্তি দেওয়া যায়, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সর্বোচ্চ পর্যায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।"

"মুখে শুধু উন্নয়নের কথা নয়, যদি দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ক্রয় ও রপ্তানির উদ্যোগ না আসে, তবে আগামী মৌসুমে এই মাঠে আলু থাকবে না— শুধু থাকবে হারানো স্বপ্ন আর হিসাবের খাতায় লাল দাগ।" এমনটি বলছেন আলু চাষিরা। 


Loading...
Loading...

- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: