মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ৪৫টির ইটভাটা। নেই কোন পরিবেশগত ছাড়পত্র। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এগুলোতে অবৈধভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। ইট তৈরি হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি দিয়ে। আইন অনুযায়ী এভাবে কৃষিজমির মাটি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও আইন অমান্য করে তৈরি করা হচ্ছে ইট। জমির উপরিভাগের চার-ছয় ইঞ্চি মাটিতেই সবচেয়ে বেশি উর্ববতা শক্তি থাকে। ফলে এটি কেটে নিলে দীর্ঘ সময়ের জন্য কৃষিজমি অনুর্ব হয়ে পড়ে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নির্দেশনায় ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্ত্বাবধানে গত (২৩ ফেব্রুয়ারি) সোমবার বিকালে কুলাউড়া উপজেলায় অভিযান পরিচালনা করে অনুমোদনবিহীন ভাবে কৃষি জমি হতে মাটি কর্তন ও কৃষি জমি ভরাট করায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর আওতায় ১ টি মামলায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে একটি এক্সক্যাভেটরের ব্যাটারি জব্দ করা হয়। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলাসহ ৪৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর সবগুলোই চলছে অবৈধভাবে। ২৩টি ভাটার আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেও পরে সেটি বাতিল করা হয়েছে। তাতে অবশ্য সেগুলোর কার্যক্রমে ছেদ পড়েনি। ছয় মাস পরপর উচ্চ আদালতে রিট করে ভাটার কার্যক্রম চালাচ্ছেন মালিকপক্ষ। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এ বলা হয়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক পযুুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে। কৃষিজমি, পাহাড়, টিলা থেকে মাটি কেটে ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বাস্তবে এই আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রমতে প্রতিবছর আনুমানিক দুই থেকে আড়াই কোটি ঘনফুট ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়। এতে একদিকে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে অন্যদিকে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ইট প্রস্তুত নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং লোকালয় থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে কোনো ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বেশির ভাগ ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সড়কের পাশে।
কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল ও সদর উপজেলা-সর্বত্র একই চিত্র। এমনকি কোথাও এক কিলোমিটারের মধ্যে ৩-৪টি ভাটাও রয়েছে।
বিভিন্ন ইট ভাট ঘুরে দেখা যায় কৃষি জমি থেকে মাটি এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ইট ভাটার পাশে। বেশির ভাগ মাটি আনা হয়েছে তিন ফসলি জমি থেকে। একেকটি ভাটায় বছরে ২০-৩০ লাখ ইট পোড়ানো হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের জেলার সাধারন সম্পাদক নূরুল মোহাইমীন বলেন, অবৈধ ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নিয়ে কৃষি ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করে ইটভাটাকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।
এ বিষয়ে ভাটার মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আইনি জটিলতা এড়াতে উচ্চ আদালতে রিট করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব ভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ইটভাটাই আদালত থেকে রিট করে চালানো হচ্ছে।