ধর্মীয় ভক্তি আর কীর্তনের সুরে মুখরিত ছিল ভোলার তজুমদ্দিনের আড়ালিয়া গ্রাম। কিন্তু সেই পবিত্র পরিবেশেই ঘটেছে এক ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনা। উপজেলার একটি উপাসনালয় এলাকা থেকে এক বাকপ্রতিবন্ধী হিন্দু গৃহবধূকে (২৫) তুলে নিয়ে রাতভর গণধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে উপজেলার আড়ালিয়া গ্রামে শ্রী শ্রী অনীল বাবাজীর তিরোধান উৎসব (কীর্তন) চলছিল। ওই নারী সেখানে অংশ নিতে যান। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে উপাসনালয়ের আশপাশ এলাকা থেকে কয়েকজন অটোচালক তাকে প্রলোভন দেখিয়ে অটোরিকশায় তুলে নেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, পরে তাকে শশীগঞ্জ গ্রামের দাসপাড়া এলাকার একটি নির্জন সুপারি বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মুখ চেপে ধরে এবং জোরপূর্বক চেতনানাশক জাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি সাহায্যের জন্য স্পষ্টভাবে চিৎকারও করতে পারেননি।
সোমবার ভোরে সেহেরির পর স্থানীয় মুসল্লিরা মসজিদে যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে ওই নারীকে বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক নামে এক ব্যক্তি প্রথম তাকে দেখতে পান। পরে ব্যবসায়ী স্বপন দাসসহ স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালের আরএমও ডা. সামছুল আলম সোহেল জানান, হাসপাতালে আনার সময় ভুক্তভোগীর শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং তার অবস্থা গুরুতর ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভোলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাইনোরিটি রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট সুশান্ত দাস গুপ্ত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি শুধু একটি ধর্ষণের ঘটনা নয়; এটি ধর্মীয় নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু নারীদের সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। উপাসনালয় এলাকা থেকে একজন নারীকে তুলে নেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।” তিনি দ্রুত বিচার ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান।
স্থানীয় সমাজকর্মী সাদির হোসেন রাহিম বলেন, বাকপ্রতিবন্ধী এক নারীর ওপর এমন পাশবিকতা দেশের জন্য লজ্জাজনক। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
এদিকে তজুমদ্দিন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ হাসপাতাল থেকে আলামত হিসেবে রক্তমাখা কাপড় জব্দ করেছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এই এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রাকিব নামের একজনকে আটক করে জিজ্ঞেসাবাদ করেছে পুলিশ।
এ নৃশংস ঘটনায় তজুমদ্দিনসহ পুরো ভোলা জেলায় উদ্বেগ ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত বিচার এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।