আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পুরো দেশ

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ সারা দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে আয়োজিত হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট।

2026-02-12T11:23:25+00:00
2026-02-12T11:23:25+00:00
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পুরো দেশ
আজ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-গণভোট
শাকিল আহমেদ
বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৩ এএম 
সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ সারা দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে আয়োজিত হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে যা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করছেন। দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হচ্ছে, যা এ নির্বাচনে যুক্ত করেছে ভিন্নমাত্রা। 

#প্রচারণা শেষে ভোটযুদ্ধ
#ঢাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা, মোতায়েন রয়েছে সোয়াত, কে-৯ ও ক্রাইম সিন টিম 

প্রচারণা শেষে ভোটযুদ্ধ : দীর্ঘ প্রচারণা, জোট-সমীকরণ, কৌশলগত অবস্থান এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক তৎপরতার পর আজ ভোটের লড়াইয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিবেন প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশন বলছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে নির্বাচন ঘিরে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা না ঘটে, সে জন্য নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কার্যত পুরো দেশই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির আওতায়। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে দেশ : এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সারাদেশে মোতায়েন রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা পরিকল্পনা। মোতায়েনকৃত বাহিনীর মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন), আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা। সংখ্যার হিসেবে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখের বেশি আনসার ও ভিডিপি সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য এবং ৯ হাজার ৩৪৯ জন র‌্যাব সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব বাহিনী মাঠে থাকবে। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়, ব্যালট পরিবহন ও গণনা কেন্দ্রেও রয়েছে কড়া নিরাপত্তা।

ঢাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা, মোতায়েন রয়েছে সোয়াত, কে-৯ ও ক্রাইম সিন টিম : এদিকে রাজধানী ঢাকায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ডিএমপির ২৬ হাজার ৫১৫ জন সদস্য নির্বাচনী দায়িত্বে মোতায়েন রয়েছেন। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি বাইরে স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষায়িত বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াত, কে-৯ ইউনিট ও ক্রাইম সিন ভ্যানও মাঠে রয়েছে।      

ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন, পুলিশ আপনাদের পাশে রয়েছে।

ম্যাজিস্ট্রেট ও মোবাইল কোর্ট সক্রিয় : নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়ন ও তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিতে ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, অভিযোগ তদন্ত এবং আইনভঙ্গের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, অবৈধ প্রচারণা, অস্ত্র প্রদর্শন বা ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।

প্রযুক্তির নজরদারিতে ভোট : এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে লাইভ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক আইনশৃঙ্খলা সদস্যের শরীরে বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা সংযুক্ত রয়েছে, যাতে ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়। আনসার ও ভিডিপির ১ হাজার ১৯১টি স্ট্রাইকিং টিম জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। কমিশন আশা করছে, প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে নির্বাচনী অনিয়ম ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

সহিংসতার প্রেক্ষাপট ও সতর্কতা : সর্বোচ্চ প্রস্তুতির মধ্যেও নির্বাচনের আগে কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪১১টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

আইজিপি জানিয়েছেন, নির্বাচনী পরিবহন, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। লাইসেন্সধারী অস্ত্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আগেই, যাতে ভোটের সময় কোনো অপব্যবহার না ঘটে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশাসনের এই কঠোর প্রস্তুতি সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে : এবারের ভোট কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি গণভোট, যেখানে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে জনগণের মতামত চাওয়া হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলেও এটি গণতান্ত্রিক চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভবিষ্যতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষকরাও মাঠে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রয়েছে এ নির্বাচনের ওপর। নির্বাচন কমিশন বলছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

এবারের নির্বাচনে প্রায় ৯.৫৮ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি, ২ হাজার ৭৫৫ জন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি, সব মিলিয়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, এই বিস্তৃত নিরাপত্তা ও কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। তবে শেষ কথা বলবে জনগণের রায়। আজকের ভোট শুধু প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করবে না, নির্ধারণ করবে দেশের আগামী রাজনৈতিক গতিপথও। এখন সবার দৃষ্টি ফলাফলের দিকে। ভোটের বাক্সে বন্দী রয়েছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা। গণতন্ত্রের এই মহাযজ্ঞ কতটা শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়, সেটিই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: