আর মাত্র ১১ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক উত্তাপ। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নগরজুড়ে শুরু হয়েছে প্রার্থীদের জোরেশোরে প্রচারণা। তবে এই প্রচারণার সঙ্গে সমানতালে বাড়ছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলি-গলি, দেয়াল, ফুটপাত, সড়ক বিভাজক ও গোলচত্বর, সবখানেই পার্থীদের রঙিন বিলবোর্ড, পোস্টার ও ফেস্টুনে কার্যত ঢেকে গেছে নগরীর চেহারা।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী যেখানে দেয়ালে পোস্টার লাগানো, রঙিন বিলবোর্ড বা বড় ব্যানার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেখানে বাস্তব চিত্র যেন তার ঠিক উলটো। পর্যবেক্ষকদের মতে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমেছেন প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থী, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা এই ক্ষেত্রে কেউই পিছিয়ে নেই।
শনিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, শ্যামলী ও আগারগাঁও এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে আচরণবিধি ভাঙার দৃশ্য চোখে পড়ে না। সড়ক বিভাজক, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ফুটওভারব্রিজ ও গোলচত্বরের আশপাশে একাধিক প্রার্থীর বিশাল আকারের রঙিন বিলবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও একই জায়গায় একাধিক প্রার্থীর পোস্টার একটির ওপর আরেকটি সাঁটানো, যেন কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে কারওয়ানবাজার গোলচত্বরে জামায়াত, বিএনপি সমর্থিত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বড় আকারের রঙিন বিলবোর্ড নজরে পড়ে, যা সরাসরি নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এসব বিলবোর্ড ও পোস্টার শুধু নগর সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং যান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে।
আচরণবিধিতে কী বলা আছে : ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীরা কেবল ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে রঙিন প্রচার চালাতে পারবেন। ছাপানো প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আকার, সংখ্যা ও রঙের কড়াকড়ি রয়েছে।
বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, দেয়ালে পোস্টার লাগানো, রঙিন বিলবোর্ড, বড় ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি আলোকসজ্জা ও উচ্চ শব্দে প্রচারণার ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে রাজধানীর চিত্র এসব বিধির সম্পূর্ণ বিপরীত।
এদিকে রাজধানীর ঢাকা-১২ আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র সবচেয়ে প্রকট। এই আসনের বিভিন্ন অলিগলি, দেয়াল ও মোড়ে এখনও এবি পার্টি ও লেবার পার্টির সমর্থকদের পোস্টার দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের প্রার্থীর রঙিন বিলবোর্ড ও পোস্টারও একাধিক স্থানে চোখে পড়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন রং ও নকশার অসংখ্য ফেস্টুন অলিগলির ওপর ঝুলতে দেখা যায়, যা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন সম্প্রতি দাবি করেন, আমাদের কোনো পোস্টার নেই। যদি থেকেও থাকে, সেগুলো আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগের। সব পোস্টার এক দিনে সরানো সম্ভব নয়। আর আমরা কোনো রঙিন ব্যানার ব্যবহার করিনি। তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য ভিন্ন। স্থানীয় কয়েকজন জানান, নতুন পোস্টার ও ফেস্টুন এখনও লাগানো হচ্ছে, বিশেষ করে রাতের বেলায়। আর ঢাকা-১২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর ক্ষেত্রেও বিলবোর্ড ও রঙিন পোস্টারের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এমনকি তার কিছু পোস্টার এখনও ঢাকা-৮ আসনের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রার্থী সাইফুল হক বলেন, প্রথমে আমি ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। সে সময় কিছু পোস্টার টানানো হয়েছিল। পরে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ঢাকা-১২ আসনের জন্য আলাদা করে কোনো পোস্টার ছাপানো হয়নি।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ব্যতিক্রম নন : শুধু দলীয় প্রার্থীরাই নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আচরণবিধি লঙ্ঘনে পিছিয়ে নেই। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিশাল আকারের রঙিন বিলবোর্ড এখনও দৃশ্যমান। যদিও প্রকাশ্যে তারা সবাই আচরণবিধি মানার দাবি করছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নিরব বলেন, আমি আচরণবিধি মেনেই প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছি। অন্যদের নতুন পোস্টার আছে, আমার কোনো নতুন পোস্টার নেই। তবে সরেজমিন চিত্র তার দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না বলে জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান : এতসব দৃশ্যমান লঙ্ঘনের পরও নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতিকে ‘সন্তোষজনক’ বলেই মূল্যায়ন করছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অনেক ভালো। গণমাধ্যমে যে বিষয়গুলো আসছে, সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের জানানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিবারণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইসির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশের ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৯৪টি মামলা হয়েছে। কয়েকজন প্রার্থীকে সতর্ক করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় নির্বাচনী বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, আচরণবিধি থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ না হলে এসব বিধি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্য লঙ্ঘনের পরও যদি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে তা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নেতিবাচক বার্তা ছড়াবে।
নাগরিক সমাজ বলছে, নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়; পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে সমান আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করাই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল শর্ত। এখন দেখার বিষয়, শেষ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশন কতটা দৃঢ়ভাবে আচরণবিধি বাস্তবায়নে নামে, নাকি রাজধানীর দেয়াল ও বিলবোর্ডে লেখা প্রতিশ্রুতির মতোই আচরণবিধিও থেকে যাবে কেবল কথার মধ্যেই।