আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী উত্তাপ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়, যা ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত চলবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভোটকে ঘিরে প্রতিদিনই বাড়ছে জনসমাগম, রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির জোরালো উচ্চারণ।
#আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর ইসি
#সহিংসতার শঙ্কা, নিরাপত্তা জোরদার
#প্রশাসনিক ও ব্যাপক আইনি প্রস্তুতি
গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্রই এখন নির্বাচনী আমেজ। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের জনসভা, পথসভা, গণসংযোগ ও মিছিল চলছে পুরোদমে। যদিও এবারের নির্বাচনে পোস্টার টানানো নিষিদ্ধ, তবুও লিফলেট বিতরণ, ব্যানার, মাইকিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিডিও বার্তা, লাইভ বক্তব্য ও গ্রাফিক প্রচারণা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এবারের প্রচারণায় সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো উন্নয়ন ও অবকাঠামোর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল ইস্যু প্রায় সব দলের প্রধান নির্বাচনী বার্তায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধজনিত উদ্বেগ সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলায় ভোটারদের মন জয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সারা দেশের ৩০০ আসনের প্রতিটি প্রার্থীই ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন। চায়ের দোকান, বাজার, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট অফিস, সবখানেই চলছে গণসংযোগ। উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা ও সরাসরি আলোচনায় প্রার্থীরা এলাকার সমস্যা শুনছেন এবং সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। প্রায় সব প্রার্থীই ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। দলীয় পরিচয়, প্রভাব কিংবা আত্মীয়তার অজুহাতে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না, এমন প্রতিশ্রুতিও শোনা যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি সভা থেকেই।
আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর ইসি : নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রচারণার নামে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ, উপহার বিতরণ, অর্থ বা সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং কোনো ধরনের প্রলোভনকে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে ইসি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আটটি জেলায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে। ইসি জানিয়েছে, সব অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রচারণার কেন্দ্রে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূল : চলমান প্রচারণায় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে একই সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস একাধিক সভায় বলেছেন, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি এ লক্ষ্যে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন। বিএনপির আরেক প্রার্থী মো. তমিজ উদ্দিন বলেন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকেই দলীয় কাঠামোয় স্থান দেওয়া হবে না। একই ধরনের প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও ১০-দলীয় জোটের নেতাদের কাছ থেকেও। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক জনসভায় বলেন, আমরা চাঁদা নেব না, কাউকে নিতেও দেব না। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি।
সহিংসতার শঙ্কা, নিরাপত্তা জোরদার : যদিও প্রচারণার শুরুর দিনগুলো তুলনামূলক শান্ত ছিল, তবুও কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, প্রার্থীদের গাড়িতে হামলা ও প্রচারণায় বাধার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও সহিংসতার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত বছর রাজনৈতিক সংঘাতের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য, যা এবারের নির্বাচনেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এনেছে।
প্রশাসনিক ও ব্যাপক আইনি প্রস্তুতি : এদিকে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসি ও প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন, সিসিটিভি ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার তদারকি এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি নজরদারি চালাচ্ছে।
ভোটারদের প্রত্যাশা : ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাশাও রয়েছে, তবে সব কিছুর আগে তারা চান ভয়মুক্ত পরিবেশ।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনী প্রচারণা শুধু উন্নয়নকেন্দ্রিক নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুকে সামনে রেখে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। তবে প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার ওপর। সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনী প্রচারণা উন্নয়নকেন্দ্রিক আলোচনার গন্ডি ছাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করেছে।