সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মঙ্গলবার দেওয়া কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এক জ্বালাময়ী বক্তৃতার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে গেছে। ওই বক্তৃতায় কার্নি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থায় একটি 'ভাঙন' ঘোষণা করেন এবং তথাকথিত 'মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকে' ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
একসময় বন্ধুত্বপূর্ণ বলে পরিচিত কার্নি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য সম্পর্ক এখন কটাক্ষপূর্ণ বাক্যবাণে রূপ নিয়েছে। শুক্রবার ট্রাম্প কানাডাকে তার ‘বোর্ড অব পিস’ থেকে বাদ দেন—যে বোর্ডে যোগ দিতেও অটোয়া আগে থেকেই অনিচ্ছুক ছিল।
অটোয়ার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অ্যারন এটিঙ্গার বলেন, সম্পর্কটি এখন 'খাদের কিনারায়' দাঁড়িয়ে।
তিনি বলেন, এটা কানাডার জন্য ভালোভাবে শেষ হবে কি না, আমরা জানি না। গত এক সপ্তাহে উপলব্ধি হয়েছে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক নেতার সঙ্গে কাজ করছে, যাকে নির্ভরযোগ্য বা হয়তো যুক্তিসংগতও বলা যায় না।
দাভোসে গ্রিনল্যান্ডের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ও শুল্কের বিরোধিতা করায় কার্নির বক্তব্য ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে। পরদিন নিজের বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে অনেক “ফ্রি সুবিধা” দেয় এবং কার্নি 'কৃতজ্ঞ নন।'
ট্রাম্প বলেন, কানাডার আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই কানাডা টিকে আছে। মার্ক, কথা বলার আগে এটা মনে রেখো।'
কার্নি যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা সম্পর্কের প্রশংসা করলেও বলেন, কানাডা 'যুক্তরাষ্ট্রের কারণে বাঁচে না। আমরা কানাডিয়ান বলেই কানাডা সমৃদ্ধ।'
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প কার্নিকে ‘বোর্ড অব পিস’-এ আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেন। এই বোর্ড গাজা উপত্যকায় শান্তি প্রক্রিয়া তদারকির জন্য গঠিত হলেও, এর এক বিলিয়ন ডলারের স্থায়ী সদস্যপদ ফি ও জাতিসংঘের বিকল্প হয়ে ওঠার ইঙ্গিত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যেও সন্দেহ রয়েছে।
‘এক বিশাল বিচ্ছেদ’
সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার কার্নি ২৮ এপ্রিল নির্বাচনে জয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হোয়াইট হাউস সফর করেন। সেই বৈঠকের পরিবেশ ছিল ট্রাম্পের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর প্রতি তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ট্রাম্প কার্নিকে 'খুব প্রতিভাবান ব্যক্তি' বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, তাদের মধ্যে 'খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা' হয়েছে যদিও কার্নি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ধারণার বিরোধিতা করেন।
ট্রাম্প কানাডা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভাষা কিছুটা কমালেও শুল্ক বাড়ানো অব্যাহত রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কানাডিয়ান জনমত এখন ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার রাষ্ট্রদূত কার্সটেন হিলম্যান বলেন, পর্দার আড়ালে আলোচনা পেশাদার থাকলেও, কানাডিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, কানাডিয়ানরা ধরে নিয়েছিল যে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক একটি শক্তিশালী, পূর্বানুমেয় ও উন্মুক্ত সম্পর্ক সবসময়ই থাকবে এবং আমেরিকানরা সেটিকে শুধু বিশ্বাসই করবে না, রক্ষা করতেও লড়বে। এখন সেটা আর নেই। ফলে মানুষের প্রতিক্রিয়া অবিশ্বাস থেকে রাগ ও দুঃখ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এটিঙ্গার বলেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন কানাডা 'যুক্তিসংগত আচরণ' আশা করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে কানাডাকে “যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আচরণ পুরোপুরি নতুনভাবে সাজাতে হয়েছে।” তিনি বলেন, এটা গত ৭৫–৮০ বছরের চর্চা থেকে এক বিশাল বিচ্ছেদ।
জুলাইয়ে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, কিছু কানাডীয় পণ্যে শুল্ক ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশে বাড়ানো হবে। অক্টোবরে আবার ১০ শতাংশ যোগ করা হয়, ওয়ার্ল্ড সিরিজে রোনাল্ড রিগানকে নিয়ে প্রচারিত এক শুল্কবিরোধী বিজ্ঞাপনের প্রতিক্রিয়ায়।
কার্নি ওই বিজ্ঞাপনের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। বিজ্ঞাপনটি তৈরি ও অর্থায়ন করেছিল অন্টারিও প্রদেশ, যার প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেম থম্পসন বলেন, 'শুল্ক কানাডার জন্য বড় সমস্যা। বিশেষ করে দক্ষিণ অন্টারিও ও দক্ষিণ কুইবেকে—যেখানে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়িশিল্প কেন্দ্রীভূত এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে তিনি বলেন, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বানানোর আলোচনা জনমতকে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত করেছে।
তিনি বলেন, কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি বাস্তব হোক বা কল্পিত গত শত বছরের বেশি সময়ে কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক পরিচালনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুলাইয়ের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কানাডিয়ানদের মনোভাব ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নেতিবাচক। ৬৪ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক, ৩৪ শতাংশের ইতিবাচক।
থম্পসন বলেন, এ কারণেই এখন কার্নির জন্য চুক্তি করা আগের মতো জরুরি নয়। কানাডার অনুভূতি হচ্ছে—খারাপ চুক্তির চেয়ে কোনো চুক্তিই ভালো। এবং আপাতত মানুষ সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে প্রস্তুত।
'আশা কোনো কৌশল নয় ট্রাম্পের বিরোধিতামূলক আচরণ সত্ত্বেও রাষ্ট্রদূত হিলম্যান আশাবাদী যে দুই দেশ শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্কে ফিরবে।
তিনি বলেন, সম্ভবত কিছু অস্থিরতা ও মন্তব্য থাকবে, কিন্তু আমরা সেখানে পৌঁছাব। কারণ সেটাই আমেরিকান শ্রমিক, কোম্পানি, কমিউনিটি ও চাকরির জন্য সবচেয়ে ভালো।'
তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আলোচিত ইউএসএমসিএ চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের কানাডায় রপ্তানি ২০ শতাংশ বেড়েছিল। তিনি বলেন,শেষ পর্যন্ত বাস্তব তথ্যই ফল নির্ধারণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বর্তমানে ইউএসএমসিএ চুক্তির পর্যালোচনা করছে, যেটিকে ট্রাম্প সম্প্রতি অপ্রাসঙ্গিক বলেছেন।
হিলম্যান স্বীকার করেন, কানাডার ব্যবসায়ী মহলে 'শিগগিরই পূর্বানুমেয়তা ফিরবেএমন বিশ্বাস নেই।'
এটিঙ্গার বলেন, সম্পর্ক কখনোই মেরামতের বাইরে নয়, তবে যোগ করেন, “কানাডা শুধু আশার নীতিতে চলতে পারে না। প্রবাদ আছে ‘আশা কোনো কৌশল নয়।’
দাভোসে কার্নি বলেন, মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর উচিত বর্তমান ব্যবস্থা ভাঙনের জন্য শোক না করে বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তি গঠনে মনোযোগ দেওয়া।
তিনি বলেন, 'নস্টালজিয়া কোনো কৌশল নয়। ভাঙনের মধ্য থেকেই আমরা বড়, ভালো, শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত কিছু গড়তে পারি। এটাই মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর কাজ।'
থম্পসন বলেন, কার্নি ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার করতে চাইবেন।
গত সপ্তাহে চীনে সফর করে বৈদ্যুতিক গাড়িতে শুল্ক শিথিল ও ক্যানোলা আমদানির বাধা তুলে নেওয়ার চুক্তি ঘোষণা করায় কার্নি বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েন। তবে ট্রাম্প এ নিয়ে বলেন, চীনের সঙ্গে চুক্তি হলে, সেটা করা উচিত।
থম্পসন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে কানাডা যদি চীনে রপ্তানি দ্বিগুণও করে, তবু তা মোট রপ্তানির মাত্র ১০ শতাংশ হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারালেও ৭০ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রেই যাবে।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে কাল হোক বা তিন বছর পর।