মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা কি তার ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানতে পারে? ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার হিতামপুর গ্রামের শচীন বিশ্বাস তার জ্বলন্ত প্রমাণ। শৈশব থেকেই তার দুটি পা নেই, চলাফেরা করেন হামাগুড়ি দিয়ে। তবুও জীবনের দীর্ঘ ৪৫টি বছর তিনি অন্যের কাছে হাত না পেতে বরং নিজের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় কাঠ খোদাই করে তৈরি করে চলেছেন খাট, পালঙ্ক, জানালা-দরজাসহ নানা আসবাবপত্র।
শৈলকুপার হিতামপুর গ্রামের মনমত বিশ্বাসের ছেলে ৬২ বছর বয়সী শচীন বিশ্বাস পেশায় একজন ‘সুতোর মিস্ত্রি’ বা কাঠমিস্ত্রি। অভাবের তাড়নায় বা শারীরিক অক্ষমতার অজুহাতে তিনি হতে পারতেন একজন ভিক্ষুক। কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ তাকে সে পথে যেতে দেয়নি।
দুই পা না থাকা সত্ত্বেও শচীন বিশ্বাস দমে যাননি। যৌবন থেকেই তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তার নিপুণ হাতে তৈরি আসবাবপত্রের কদর রয়েছে এলাকায়। প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়া এবং রাতে ফিরে আসা—এই রুটিন তার দীর্ঘদিনের। বর্তমানে তিনি একটি হস্তচালিত হুইলচেয়ার ব্যবহার করে যাতায়াত করেন।
এখন আর আগের মতো শরীরে শক্তি নেই। বয়স হয়েছে ৬২ বছর। বয়সের ভারে এখন আর হস্তচালিত হুইলচেয়ার চালিয়ে যাতায়াত করা তার জন্য অনেক কষ্টকর হয়ে পড়েছে। শচীন বিশ্বাস আক্ষেপ করে এই প্রতিনিধিকে বলেন,
"প্রতিদিন সকালে এবং রাতে হাতে টেনে হুইলচেয়ার চালিয়ে যাতায়াত করতে খুব কষ্ট হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার একটিই ইচ্ছা—যদি একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার পেতাম, তবে জীবনের বাকি দিনগুলো একটু শান্তিতে যাতায়াত করতে পারতাম।"
শচীন বিশ্বাস জানান, একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ারের জন্য তিনি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বহুবার ঘোরাঘুরি করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ পর্যন্ত কোনো দপ্তর বা জনপ্রতিনিধি তার এই ছোট স্বপ্নটি পূরণে এগিয়ে আসেনি। অভাবের কারণে নিজের পক্ষেও এই আধুনিক চেয়ারটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
পঙ্গুত্বকে জয় করা এই সাহসী কারিগর এখনো কাজ করে খেতে চান, কারো বোঝা হতে চান না। তার এই শেষ বয়সের কষ্ট লাঘবে সরকার কিংবা সমাজের কোনো বিত্তবান ব্যক্তি কি এগিয়ে আসবেন? একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ারই পারে শচীন বিশ্বাসের বাকি জীবনের চলার পথকে কিছুটা মসৃণ করতে।