আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি এবং এর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। কিন্তু বিধি না মেনে প্রার্থীরা প্রচারণায় চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী এলাকা। বড় জনসভা না করলেও উঠান বৈঠক, সভা-সেমিনারসহ নানা কৌশলে চালাচ্ছেন প্রচারণা। রাজনৈতিক দলগুলোর এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রার্থিতা, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ নানা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও কেউ করছে না আইনের তোয়াক্কা। দেশজুড়ে চলছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক। এমন পরিস্থিতিতেও নীরব ভূমিকায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিছু প্রার্থীকে শোকজ ও নামমাত্র জরিমানা ছাড়া চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেয়নি নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রচারণা চালানোর কোনো সুযোগ নেই প্রার্থীদের। কিন্তু দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, নিয়মের বাইরে গিয়ে রঙিন পোস্টার ব্যবহার, শো-ডাউন, মোটর শোভাযাত্রা, গণজমায়েত করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়া, উচ্চস্বরে বাজার কিংবা জনবহুল এলাকায় সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজিয়েও চলছে প্রার্থী ও দলীয় প্রচারণা। সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ-মাহফিলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও প্রার্থীদের ভোট চাওয়া থেমে নেই।
রাজধানী ঘুরে দেখা যায়, বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির প্রতীকের ছবিসহ রঙিন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো শহর। মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হওয়ার পরও এখনো এসব প্রচারসামগ্রী রয়ে গেছে। পুরান ঢাকা, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, শাহবাগ, ফার্মগেট, মহাখালী, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও প্রতীকের ছবিসংবলিত লক্ষাধিক রঙিন পোস্টার ঝুলছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো, বিদ্যুতের খুঁটি ও টিএনটি খুঁটিতে পোস্টার লাগানো এবং প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে রাস্তার ওপর ঝুলিয়ে রাখা ফেস্টুন চোখে পড়েছে। একদিকে সিটি কর্পোরেশন অপসারণ করলে অন্যদিকে টানায় প্রার্থীদের সমর্থকরা। দেয়াল লিখন ও চিকা মারার মাধ্যমেও প্রকাশ্যে ভোট চেয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
নির্বাচনী বিধি মোতাবেক, কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ অপরাধে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। কোনো দল বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যায়। এ ছাড়া আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থিতা বাতিল করারও ক্ষমতা আছে নির্বাচন কমিশনের। এই লক্ষ্যে গত ১৪ জানুয়ারি ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ অনুসন্ধান ও আইন লঙ্ঘনের বিষয় বিচার করতে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ৩০০ নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেদিন থেকে তাঁরা মাঠে নেমেছেন, থাকবেন নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত। এসব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত থেকে সার্বক্ষণিক নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা আছে।
নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশে যাঁদের শোকজ কিংবা জরিমানা করা হয়েছে তাঁদের বেশিরভাগই বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থী। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আছেন তালিকায়। ইতোমধ্যে অনেক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে এবং কাউকে কাউকে সামান্য আর্থিক দণ্ডও দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতীকসহ পোস্ট বা লিফলেট বিতরণের অভিযোগে কিছু এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আচরণবিধি ভঙ্গে শোকজ: ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। আসনটির নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির চেয়ারম্যান যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ফারিয়া আরজু গত শনিবার এই নোটিশ দেন। নোটিশে বলা হয়, প্রার্থী তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে পরামর্শ সভার নামে ভালুকার ভোটারদের কাছে ভোট চেয়ে বিভিন্ন এলাকায় সভা, সমাবেশ ও জনসংযোগ এবং প্রবাসী ভোটারদের কাছে ভিডিও বার্তায় ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট আহ্বান করে আসছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগে ভোট চাওয়ায় চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-মহানগরের একাংশ) মো. আনোয়ার ছিদ্দিককে শোকজ করেছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি।
ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাহিদ ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাঠিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। শোকজে বলা হয়েছে, নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজের বিশাল আকৃতির রঙিন ছবি, ঢাকা-১১ উল্লেখপূর্বক ‘দেশ সংস্কারের গণভোট হ্যাঁ-এর পক্ষে থাকুন’ স্লোগান সংবলিত বিলবোর্ড রিটার্নিং অফিসারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যা জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী। এছাড়া দলটির মুখ্য সমন্বয়ক ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ-বিজয়নগরের দুই ইউনিয়ন) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান।
জানা যায়, আচরণবিধি লঙ্ঘনে ২৭ জেলায় অন্তত ৭৩ জনকে শোকজ করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিএনপির ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১৮, এনসিপির ৪, ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুজন, গণ অধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির একজন করে আছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন পাঁচজন।
আচরণবিধি ভঙ্গে জরিমানা: ভ্রাম্যমাণ আদালতে এখন পর্যন্ত মাদারীপুরে তিনটি ঘটনায় তিন প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামের সমর্থকদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৩ ( সোনারগাঁ) আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গোলাম মসীহকে ১০ হাজার টাকা, পঞ্চগড়-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার অভিযোগে সানোয়ার হোসেন নামের একজন জামায়াত কর্মীকে ১ হাজার টাকা জরিমানা, লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শিহাব আহমেদকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য ২০ হাজার টাকা জরিমানা, ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের এক কর্মীকে ২ হাজার টাকা এবং ফেনীর তিনটি আসনে ১২ প্রার্থী ও তাঁদের নেতাদের ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর কে কতটুকু আচরণবিধি মেনে ভোটের মাঠে থাকছে তা দেখা গুরুত্বপূর্ণ। আশা করছি সব পক্ষই সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে।