ছোট হয়ে আসছে কর্মসংস্থানের বিশ্ব

এসএম শামসুজ্জোহা

জাতীয়

বিশ্বের দরজা বাংলাদেশিদের জন্য যেন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। একসময় যেখানে বিদেশ ভ্রমণ বা কর্মসংস্থানের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার সুযোগ

2026-01-09T15:23:02+00:00
2026-01-09T15:23:02+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ভিসা পাচ্ছেন না নাগরিকরা, সংকটের মুখে পাসপোর্ট হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক আস্থা
ছোট হয়ে আসছে কর্মসংস্থানের বিশ্ব
ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ হচ্ছে অনেক দেশের দরজা
এসএম শামসুজ্জোহা
শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:২৩ পিএম 
বিশ্বের দরজা বাংলাদেশিদের জন্য যেন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। একসময় যেখানে বিদেশ ভ্রমণ বা কর্মসংস্থানের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার সুযোগ ছিল তুলনামূলক সহজ, এখন প্রতিটি পদক্ষেপে জটিলতা, সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা। বিশ্বের নানা প্রান্তে একের পর এক ভিসা নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশি ফেরত, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কূটনীতিক দৈন্যদশার কারণে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক আস্থা।

তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং সম্মানিত। সারা বিশ্বে রয়েছে তাঁর বিশেষ পরিচিতি। সবাই আশা করেছিল- অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ আরও সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সব দরজা। ভিসা বন্ধসহ চলমান কূটনৈতিক দৈন্যদশার সঙ্গে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বেশ কয়েকটি দেশ।

অভিবাসন ও পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশী পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা না বেড়ে উল্টো কমছে। আন্তর্জাতিক সূচকে (হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স) বাংলাদেশী পাসপোর্টের অবস্থান এখন উত্তর কোরিয়া কিংবা লিবিয়ার পর্যায়ে। এ কারণে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসার শর্ত ও জটিলতা বাড়ছে। গত কয়েক বছর পর্যটক হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘুরতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি আর ফেরেননি। অবৈধভাবে তারা গন্তব্যের দেশে থেকে গেছেন কিংবা চোরাই পথে অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছেন। এসব কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলোয় বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ হচ্ছে কিংবা জটিলতা বাড়ছে।

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের গন্তব্য সীমিত হয়ে আসার বিষয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও সমস্যার কারণে কিছু দেশ বাংদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না কিংবা ভিসা প্রক্রিয়া জটিল করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে। এ প্রসঙ্গে পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিম জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছরই বাংলাদেশিদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভি১, ভি২ ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু চলতি সময়ে দেশটির দূতাবাস মনে হয় না এক লাখের বেশি ভিসা দিয়েছে। তিনি আরো জানান, ইউএস, জার্মান, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া বা কানাডা গত ২০২৩-২৪ সালে আমাদের অনেক ভিসা দিয়েছে, পাসপোর্টের মেয়াদ যতদিন, ততদিন পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু এখন আর কোনো ভিসা দিচ্ছে না।

জানা যায়, গণ অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারতসহ কয়েকটি দেশ। দেশটির এই সিদ্ধান্তকে অনেকটা রাজনৈতিক হিসাবে দেখা হলেও ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার অনেক দেশ থেকে সব ধরনের ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসার অপব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে কমেছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এছাড়াও দেশের বাইরে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য বিবাদে জড়ানোর কারণেও নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। ভিসা জটিলতার কারণ হিসেবে অনেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কারণ হিসেবে মনে করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মূল আরও গভীরে। তাদের মতে, অনিয়মিত পথে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে ঢোকার প্রবণতা, আর তা করতে সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর ঘটনা দেশগুলোর প্রশাসনের চোখে পড়েছে। ভিসা পাওয়ার সুযোগে বা এটাকে অপব্যবহার করে অনেকে কিন্তু অনিয়মিতভাবেও যাচ্ছে। সে প্রবণতার কারণেই যে দেশগুলোর অভিবাসনবিরোধী বার্তাবরণ নেই; সেই দেশগুলোও কিন্তু এখন সতর্ক হচ্ছে। শুধু শিক্ষার্থী ভিসাই নয়, বহুদেশ ঘোরা ব্যক্তি কিংবা কাজের জন্য শ্রমিক ভিসাও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি সময়ে ‘ইন্ডিয়া, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম এসব দেশ আমাদের ভিসা দিচ্ছে না’ বলে জানিয়েছেন ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- টোয়াবের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান। শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডের ভিসা অনেক বেশি সময় নেয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ভিসার রেশিও কম। ফিলিপাইন অনেক বেশি সময় নেয়। ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি অনেক। এমনকি অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া শ্রীলঙ্কার ইলেকট্রনিক ভিসা হতেও সময় নিচ্ছে। টোয়াবের সভাপতি বলেন, ভারতের ভিসা বন্ধ থাকায় এখন এ পর্যটকরা সরাসরি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার ভিসা আবেদন করছেন। আবেদনকারীদের চাপ বেশি হওয়ায় থাইল্যান্ড পর্যাপ্ত ভিসা দিতে পারছে না। এ কারণে তারা যাচাই-বাছাই করে কিছু ভিসা ইস্যু করছে। আর নতুন পাসপোর্ট হলে সিঙ্গাপুরের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, গত কয়েক বছরে ভিয়েতনামে যাওয়া বাংলাদেশীদের ৬০-৭০ শতাংশ দেশে ফেরেননি বলে অভিযোগ আছে। তাদের বেশির ভাগ ভিয়েতনাম থেকে অবৈধ পথে অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন। এ কারণে ভিয়েতনামের মতো দেশও বাংলাদেশীদের ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছে। কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ অভিবাসীদের কারণে দেশের সুনাম যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে; কূটনৈতিক কারণে কিছু জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক পন্থা ও ভুয়া কাগজপত্রের জটিলতা সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এসবের কারণে শ্রমবাজার হারিয়ে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা লাভের পথও বন্ধ হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনীতিক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ইস্যু নিয়ে জটিলতা ও নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। আর বিদেশে বাংলাদেশী পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতাও কমছে। অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘প্রতি বছর যে পরিমাণ মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে; দেশে তাদের সবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই কঠিন। আমরা ধরেই নিচ্ছি কিছু মানুষ বিদেশ চলে যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের এটি দেখা দরকার যে বিদেশগামী অভিবাসী শ্রমিকরা যেন শিক্ষিত ও দক্ষ হয়। আর ভুয়া ভিসা কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে কেউ যেন বিদেশ যেতে না পারে; সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: