দরিদ্র পরিবারে জন্ম জহর আলীর (৪৩)। জন্মের পর থেকেই পরিবারের অর্থনৈতিক অভাব-অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। নিজেও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দিন মজুর-শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। ২ সন্তান ও স্ত্রীসহ পরিবারের সকলকে নিয়েই স্বাভাবিকভাবে জীবন কেটে যাচ্ছিল জহর আলীর।
তবে ২ বছর আগে কিডনী রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন তিনি মৃত্যুর জন্য দিন গুনছেন। অর্থের অভাবে করাতে পারছেন না নিজের কিডনী রোগের চিকিৎসা। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বৃত্তবানদের এগিয়ে আসার আকুতিপূর্ণ অনুরোধ জহরের পরিবারের।
জহর আলী রাজবাড়ী জেলা সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের বাড়াইজুরী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার স্থানীয় জব্বার মন্ডলের ছেলে। প্রায় ১৫ বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবধ্য হন জহর-লিমা। তাদের ১১ বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান ও ৬ বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। প্রায় বছর ২ আগে তার কিডনী রোগ ধরা পরে। এখন তার অবস্থা শয্যাশয়ী প্রায়। ঠিকমতো হাটা-চলা করতে পারেন না। খেতে পারেন না খাবার।
জহর আলীর পরিবার সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরেই সে কিছুটা অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। প্রায় সোয়া ১ বছর আগে বাড়ির পাশেই কাজীর হাট বাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় মাথা ঘুরে পরে যায় জহর। তারপর এলাকার লোকজন তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। এরপর তাকে অসুস্থ অবস্থায় রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে শরীরে রক্ত শূন্যতা ধরা পরে। প্রথমে তাকে দুই ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। দিনদিন তার শারিরীক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। পরে হাসপাতাল থেকে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে শারীরিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জহর আলীর কিডনী রোগ ধরা পরে।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের বাড়াইজুরী গ্রামের জহরের পৈত্রিক নিনাসে দেখা যায়, জহর আলীর বাড়িতে একটি টিনের আধাপাঁকা চৌচালা টিনের ঘর ও একটি ছাপড়া ঘর। ছাপড়া ঘরের সামনেই জহর আলী একটি চেয়ারের উপর বসে আছে। অন্যঘরের সিড়ির উপর কান্না জর্জরিত চোখে তার বধির মা বসা। জহরের পাশেই পিড়িতে বসে স্ত্রী লিমা আক্তার কান্না করছেন।
জহরের স্ত্রী লিমা আক্তার কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলেন, “গত এক বছর যাবত আমার স্বামী ঘরে পরে আছে। সপ্তাহে ২ বার কিডনী রোগের ডায়ালাইসিস করতে হয় তাকে। ডায়ালাইসিস বন্ধ হলেই পেটে ব্যাথা শুরু হয় তার। ব্যাথা শুরু হলে আর ঠিক থাকতে পারে না। ঘরের মধ্যেই চেয়ারে টয়লেট করে। ১৫ দিন পরপর রক্ত দিতে হয় তাকে।
রাজবাড়ী জেলার কোনো হাসপাতালেই ডায়ালাইসিস হয় না। ফরিদপুর ল্যাবএইড হাসপাতালে গিয়ে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। একবার ডায়ালাইসিস করতে ২ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়। ডায়ালাইসিস ও ওষুধ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে ৮ হাজারের বেশি টাকা খরচ প্রয়োজন। যার মাসিক খরচে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। টাকার অভাবে এখন সপ্তাহে এক বার ডায়ালাইসিস করতে পারছি।”
তিনি আরও বলেন, “অসুস্থ হওয়ার প্রথম দিকে আত্মীয় স্বজনেরা সহযোগিতা করেছিল। সেটা সামান্য। এখন চিকিৎস্যার জন্য বিভিন্ন মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। টাকার অভাবে দুইবারের জায়গায় একবার ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন ওনার বেঁেচ থাকার সম্ভাবনা কম। তবে চিকিৎসা চললে কিছুদিন বেঁচে যেতে পারে। আমার কোন জমিজমাও নেই। অর্থের অভাবে বাচ্চা দুটোও বাবার বাড়িতে রেখে দিয়েছি। আমার স্বামী মারা গেলে আমার সন্তানেরা এতিম হয়ে যাবে। যদি সরকার ও সমাজের বৃত্তবানরা আমার স্বামীর চিকিৎসায় এগিয়ে আসে তাহলে তিনি হয়তো আরও কিছুদিন বেঁচে যেতে।”
প্রতিবেশী ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক আবু আখের বলেন, ‘জহর আলী একজন পরিশ্রমী যুবক। মাঠে কাজকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বছর খানেক ধরে কিডনী রোগে আক্রান্ত হয়ে সে ঘরে পরে আছে। এলাকার লোকজন চিকিৎসার জন্য কিছু সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এখন আর তাতে হচ্ছে না। চিকিৎস্যা চালিয়ে যেতে তার অনেক টাকার প্রয়োজন। আমাদের জেলায় বা জেলার বাইরে অনেক বৃত্তবান লোক আছেন। তারা যদি তার চিকিৎসায় এগিয়ে আসে তাহলে জহর আলী হয়তো সন্তানদের নিয়ে আরও কিছুদিন কাটাতে পারতো।’
স্থানীয় চন্দনী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. নায়েব আলী বলেন, জহর খুবই ভালো একটি ছেলে। অসুখে পরে এখন কঙ্কালসরূপ হয়ে গেছে। আমরা তাকে সামান্য সহযোগিতা করতে পেরেছি। এলাকার লোকও কিছু সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এই টাকায় তো আর তার হচ্ছে না। সরকার যদি বড় অঙ্কের একটি টাকা তাকে সহযোগিতা করতো তাহলে সে চিকিৎসাটা চালিয়ে যেতে পারতো।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রুবাইয়াত মো. ফেরদৌস বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত অসহায়দের আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। আর্তিক সহায়তার জন্য কিডনী রোগে আক্রান্ত জহর একটি আবেদন করেছিল। তার আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।