
২০ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর মালিবাগের জেএস হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করতে যান আহনাফ তাহমিন (১০)। রাত আটটার দিকে খতনা করানোর জন্য অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয় আহনাফের শরীরে, এরপর আর ঘুম ভাঙেনি তার। ঘণ্টাখানেক পর হাসপাতালটির পক্ষ থেকে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ল্যাবএইডে এন্ডোস্কোপি করাতে যান ‘স্টার্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান’র প্রোডাক্ট ম্যানেজার রাহিব রেজা (৩১)। ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালে এন্ডোস্কোপি করাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে। তবে স্বজনদের অভিযোগ, ল্যাবএইড হাসপাতালে পরীক্ষার রিপোর্ট না দেখেই রাহিব রেজার শরীরে অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয়। শারীরিক জটিলতার মধ্যেই করা হয় এন্ডোস্কোপি। একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থা আরও অবনতি হয় এবং গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে ল্যাবএইড হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটে জীবনাবসান।
এছাড়া গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে বলি হয়েছে আরেক শিশু আয়ান। রাজধানীর বাড্ডা এলাকাস্থ ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। যা নিয়ে গোটা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জানা যায়, ওইদিন সকাল ৯টার দিকে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগের পর আর জ্ঞান ফেরেনি শিশুটির। পরবর্তীতে তাকে গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) তাকে টানা সাত দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় এবং চিকিৎসক গত ৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাত্র দেড় মাসের মধ্যে এই তিনটি মৃত্যু নিয়েই পরিবার ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলেছেন। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে এবং আরেকটিতে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
শুধু আহনাফ, রাহিব কিংবা আয়ানই নয়, দেশে প্রায়ই ঘটছে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা। এর মধ্যে কোনটা মিডিয়ার কারণে প্রকাশ্যে এলেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব, ভুয়া চিকিৎসকের দৌড়াত্ম, অসাধু চিকিৎসকদের আর্থিক লালসাসহ বিভিন্ন কারণ এর পেছনে দায়ী রয়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টস্-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, রোগীকে কম বা বেশি, জটিল বা সাধারণ অপারেশন-একই ব্যবস্থাপনায় এনেসথেসিয়া দিতে হয়। তবে এনেসথেসিয়া দেওয়ার জন্য আগে তিনটি বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। প্রথমে দেখতে হবে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা। অপারেশন করার যন্ত্রপাতিসহ সঠিক ব্যবস্থাপনা আছে কিনা। অনেক ওষুধ রয়েছে যা প্রয়োগ করা হলে বেশিরভাগ সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতি হয় না। তবে আবার জটিলতা হওয়ার আশংকা রয়েছ। ওই সময় আইসিইউ এবং সিসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। রোগীকে এনেসথেসিয়া দেওয়ার আগে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের। আর যিনি এনেসথেসিয়া দিবেন তিনি প্রকৃতপক্ষে এনেসথেসিওলজিস্ট কিনা সেটা দেখতে হবে। রোগীকে এনেসথেসিয়া দেওয়ার উপযোগী কিনা তা আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। কোন কিছু পরীক্ষা না করে কথায় কথায় এনেসথেসিয়া দিলে রোগীর মৃত্যুসহ যেকোন ধরনের জটিলতার সম্ভাবনা বেশি। সারাদেশে প্রতিদিনই আয়ান ও আহনাফদের মতো ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সিজারের নামে বাণিজ্য চলছে। অব্যবস্থাপনার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার বাণিজ্য চলছে। সম্প্রতি দুটি শিশু খতনা করতে গিয়ে মারা যাওয়া অব্যবস্থাপনায় দায়ী।
ঘটনার পর দায় এড়াতে ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ : ডাইগনস্টিক কিংবা হাসপাতাল কোথায় ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে দায়ে এড়াতে ব্যস্থ হয়ে পড়েন সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতাল কতৃপক্ষ দায় চাপাতে থাকেন ডাক্তারের উপর। অন্যদিকে ডাক্তার দায় চাপায় হাসপাতালের ল্যাব কিংবা অপারেশন থিয়েটারে কর্মরতদের উপর। তাহলে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর এ দায় কার?
বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক অর্ধ লক্ষাধিক, লাইসেন্সধারী ১৫ হাজার : দেশে লাইসেন্সধারী বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বø্যাড ব্যাংক আছে ১৫ হাজার ২৩৩টি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চালু আছে অর্ধ লক্ষাধিক। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবকাঠামো এবং চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী সব বিষয়ে বড় ঘাটতি নিয়ে চলছে। চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট তো দূরের কথা, ভুয়া ডিগ্রির লোকজন দিয়ে এসব অবাধে চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযানও চালায়, তারপর আবার সব আগের জায়গায় ফিরে যায়। সংখ্যায় হাসপাতাল, ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনেক। কিন্তু চিকিৎসা বলে তেমন কিছু গড়ে উঠেনি।
সরকারি হাসপাতালে সক্রিয় দালাল চক্র-বেসরকারি যেন কষাইখানা : সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দালালদের অত্যাচার, দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হলেও হয়রানি কম বলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সারাবছর রোগীদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলো কসাইখানা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে বেসরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণে আসা যাচ্ছে না কোনোভাবেই।
ডাক্তারদের দায়সারা ডিউটি-রোগী দেখেন প্রাইভেটে : সরকারি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক অভিযোগ যে তারা হাসপাতালে থাকেন না, গ্রাম পর্যায়ে আরও বেশি থাকেন না। ঢাকার বাইরে থাকা ডাক্তাররা সরকারি বেতন নিচ্ছেন, আবার সেই সময়টায় ঢাকার কোনও প্রাইভেট হাসপাতালে বড় অংকে কাজ করছেন, কিংবা নিজে প্রাইভেট রোগী দেখছেন বা অন্য কোনও কাজ করছেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সারা দেশে স্বাস্থ্যের কোথায় কি ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করবো। ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যা যা করার করবো। অপচিকিৎসার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।