প্রকাশ: সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৪, ১:৩৩ পিএম (ভিজিটর : ১৭৮)
বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন ক্রলিংপেগ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকার পর হঠাৎ চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে। বছর শেষে বকেয়া পরিশোধের চাপে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিদেশের ব্যাংকে বিপুল আমদানি দায় রেখে পালিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অতি ঘনিষ্ঠজনরা। এখন সেসব দায় পরিশোধ করতে গিয়ে চাপে পড়েছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা থাকায় বেশি দামে ডলার কিনে পরিশোধ করতে হচ্ছে দায়দেনা। যদিও এসব দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণ তৈরি হচ্ছে লুটেরা চক্রের নামে; যা আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে একদিকে বকেয়া পরিশোধের চাপ দেওয়া হচ্ছে, অপরদিকে ডলারের জোগান কম। দরও নির্ধারণ করা। এখন নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ করতে গিয়ে বেশি দরে ডলার কিনতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ডলার সংকটে রেমিট্যান্স কিনেছে সর্বোচ্চ ১২৮ টাকায়। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত দর ১২০ টাকা। আর কার্ব মার্কেটে বা খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে ১২৯ টাকায় পৌঁছেছে। এক সপ্তাহ আগেও যা ছিল ১২৩ থেকে ১২৪ টাকা। তথ্যমতে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথমবারের মতো ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে দেশের ডলার বাজারে। চলতি ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দর অন্তত ৪ টাকা বেড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছর শেষে আমদানির দায় পরিশোধের চাপ তৈরি হয়। ডিসেম্বরে শেষ হয় একটি বড় অংশের এলসির মেয়াদ। তাই বেশি দামে ডলার কিনে আমদানি দায় পরিশোধ করছে ব্যাংকগুলো। যার প্রভাবে খোলাবাজারেও এখন ডলারের দাম চড়া।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসী আয় হলো দেশের ডলার জোগানের একমাত্র দায়বিহীন উৎস। কারণ এই আয়ের বিপরীতে কোনো বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয় না অথবা কোনো দায় পরিশোধ করতে হয় না। রপ্তানি আয়ের বিপরীতে ডলার এলেও আবার কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে তা খরচ করতে হয়। বিদেশি ঋণও শোধ করতে হয় ডলারে। কাজেই প্রবাসী আয় যত বাড়বে, দেশে ডলারের সংকট তত কমবে। জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, হঠাৎ ডলার বাজার অস্থিরতার পেছনে মোটা দাগে দুটি কারণ আছে বলে মনে হচ্ছে। প্রথমত. বকেয়া পরিশোধের চাপ থাকা, দ্বিতীয় কারণ সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগে ডলার মজুত রাখার প্রবণতা তৈরি হওয়া। তিনি বলেন, আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ক্রলিংপেগ নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজার কোন দিকে যায় সেটি বুঝতে অনেকে হয়তো ডলার ধরে রাখছেন। অপরদিকে বকেয়া পরিশোধের চাপ সামলাতে ব্যাংকগুলো বেশি দরে ডলার কিনছে। এখন সিদ্ধান্ত যাই আসুক সেটি যেন দ্রুত দেওয়া হয়; তাহলে বাজার তার গতিপথ খুঁজে পাবে।
ব্যাংকাররা জানান, ডিসেম্বরের শুরুতে পুরোনো আমদানি দায় পরিশোধের জন্য কয়েকটি সরকারি ও একটি বেসরকারি খাতের ব্যাংক বেশি দামে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনতে শুরু করে। এতে অন্য ব্যাংকও বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য হয়। ফলে হঠাৎই ডলারের দাম বেড়ে যায়। বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দামে ডলার কেনায় ১৩টি ব্যাংককে চিহ্নিত করে সম্প্রতি তাদের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাখ্যা চাওয়া ব্যাংকের তালিকায় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ২টি এবং বেসরকারি খাতের ১১টি ব্যাংক ছিল। এরপর ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স ডলারের দাম কমিয়ে আনে। এদিকে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেমিট্যান্সের দর ১২৩ টাকা হলে আমদানিকারকে খরচ পড়ছে ১২৪ টাকার বেশি। সে তুলনায় দাম কম পাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। তাদের ডলার নগদায়ন করতে হচ্ছে ১১৯ টাকায়। এতে অন্তত ৫ টাকা ঠকছেন রপ্তানিকারকরা। ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছর শেষ হয়ে আসায় অনেক আমদানি বিল একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। তেল, রাসায়নিক সার ও রমজানের পণ্য আমদানির জন্য বেশি ডলার প্রয়োজন। এই কারণে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আগের মতো সব রেমিট্যান্স হাউস থেকে ডলার মিলছে না। কিছু কোম্পানি অন্যান্য ছোট কোম্পানি থেকে ডলার কিনে নিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বেশি দামে আমাদের ডলার নিতে হয়। ফলে দাম বেশি পড়ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনছে। যদিও বর্তমানে রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপে পড়ে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমানতালে ডলার কেনার কারণে ডলার বাজারে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা জানান, নিউ ক্রলিংপেগ নামে একটি পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। এছাড়া বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে শিগিগিরই নতুন সিদ্ধান্ত আসছে। এতে ডলারের দর পুরোপুরি বাজারভিত্তিক না হলেও বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ট হবে। তবে সিদ্ধান্ত যাই আসুক ডলারের দর কমে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা না থাকায় অনেকেই ডলার ধরে রাখেন। কারণ যখন নতুন সিদ্ধান্ত আসছে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়; তখন বাজারে বিভিন্ন ধরণের জল্পনা-কল্পনা দেখা দেয়।